থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী কম্বোডিয়ার উপর সাম্প্রতিক স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। দুই সপ্তাহ আগে, সপ্তাহের পর সপ্তাহের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর উভয় দেশ শনিবার দুপুর ১২টায় একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করে সামরিক কার্যক্রম স্থগিতের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে থাই সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত রবিবার রাতে কম্বোডিয়া সীমান্ত থেকে ২৫০টিরও বেশি ড্রোন উড়ে গিয়ে সীমান্ত রেখা অতিক্রম করেছে। এই ঘটনা থাইল্যান্ডের মতে চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
চুক্তির মূল শর্তে উভয় পক্ষকে বর্তমান সামরিক অবস্থান বজায় রাখতে, নতুন সেনা মোতায়েন না করতে এবং সীমান্তে বসবাসকারী বেসামরিকদের দ্রুত বাড়ি ফেরার অনুমতি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে, সীমান্ত অঞ্চলে চলমান সংঘর্ষের ফলে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। এই বিশাল স্থানান্তর মানবিক সংকটকে তীব্রতর করে তুলেছিল।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বহু দিনের আলোচনার পর এই চুক্তি দু’দেশের জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। উভয় দেশের কূটনীতিকরা শান্তি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছিল। তবে থাইল্যান্ডের সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সাম্প্রতিক ড্রোন আক্রমণ চুক্তির মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ণ করেছে।
রয়্যাল থাই আর্মি চুক্তির শর্তের বিরোধী কম্বোডিয়ার পদক্ষেপকে ‘উস্কানিমূলক’ এবং ‘উত্তেজনা হ্রাসের ব্যবস্থার পরিপন্থী’ বলে বর্ণনা করেছে। তারা যুক্তি দিয়েছে, এই ধরনের কাজ চুক্তির শর্তের সঙ্গে ‘অসংগতিপূর্ণ’ এবং শান্তি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষয় করে। থাইল্যান্ডের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে, তারা চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
থাইল্যান্ড আরও জানিয়েছে, জুলাই মাস থেকে তাদের হেফাজতে থাকা ১৮ জন কম্বোডীয় সৈন্যের মুক্তি বিষয়টি এখন পুনর্বিবেচনা করা হবে। এই সিদ্ধান্তটি ড্রোন আক্রমণের পরপরই প্রকাশিত হয়েছে, যা থাই কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে। থাই সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যদি ‘চুক্তি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত থাকে’, তবে তারা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।
কম্বোডিয়া এই অভিযোগের কোনো মন্তব্য করেনি, ফলে দুই দেশের মধ্যে তথ্যের পারস্পরিক ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই, থাইল্যান্ডের অভিযোগের আগে, যুদ্ধবিরতির প্রশংসা করে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দ্রুত ও সুষ্ঠু সমাপ্তি’ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। থাইল্যান্ডের অভিযোগ প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর এই মন্তব্যের মুখে নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
সীমান্ত বিরোধের ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের। গত বছরের শুরুর দিকে, বিতর্কিত সীমান্তের মন্দিরে একদল কম্বোডীয় নারী দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার পর নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। মে মাসে একটি সংঘর্ষে একজন কম্বোডীয় সৈন্য নিহত হন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে গত দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে দেয়। জুলাই মাসে টানা পাঁচ দিনের তীব্র লড়াইয়ে কয়েক ডজন সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, এবং একই সময়ে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা দিয়ে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, “দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোতে এই ধরনের সীমান্ত সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।” তারা আরও যোগ করেন, “চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তির ভূমিকা যদি সমন্বিত না হয়, তবে শান্তি প্রক্রিয়ার টেকসইতা ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
বর্তমানে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া উভয়ই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে পরবর্তী আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আঞ্চলিক সংস্থা ASEAN-ও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করেন, পরবর্তী সপ্তাহে দু’দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা পুনরায় টেবিলে বসে, চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও লঙ্ঘনের পরিণতি নির্ধারণের জন্য একটি যৌথ তদারকি কমিটি গঠন করতে পারে।
যদি ড্রোন আক্রমণ এবং অন্যান্য লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে, থাইল্যান্ডের সম্ভাব্য সামরিক প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ উভয়ই পরিস্থিতি জটিল করতে পারে। তাই, উভয় পক্ষের জন্য এখনই স্বচ্ছতা বজায় রাখা, মানবিক সহায়তা চালিয়ে যাওয়া এবং কূটনৈতিক চ্যানেলকে সক্রিয় রাখা জরুরি। এই প্রক্রিয়ার সাফল্যই ভবিষ্যতে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হবে।



