সেন্টমার্টিন থেকে রাত ৮টায় রওনা নেওয়া পাঁচটি পর্যটকবাহী জাহাজ প্রায় আট ঘণ্টা পর কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাটে ফিরে এসেছে। জাহাজগুলো রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) সকাল ৭টায় ১,৯০৫ যাত্রীসহ রওনা হয়, সন্ধ্যা ৬টায় সেন্টমার্টিনে পৌঁছে মাত্র দেড় ঘণ্টা থেমে আবার কক্সবাজারের দিকে রওনা দেয়। তবে বাঙ্কখালী নদীর তীব্র কুয়াশা ও প্রবাহের কারণে জাহাজগুলো মোহনা গাঁয়ের কাছে আটকে যায় এবং নির্ধারিত সময়ের তিন থেকে চার ঘণ্টা পরে অবশেষে নুনিয়ারছড়ায় পৌঁছায়।
এই অপ্রত্যাশিত বিলম্বের ফলে বহু পর্যটকের যাত্রা পরিকল্পনা ব্যাহত হয়েছে। ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিনে গিয়েছিলেন মুবিনুল আমিনের দল, যাঁরা কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে গিয়ে সেন্টমার্টিনে পৌঁছেছিলেন এবং রাত ১০টার মধ্যে ফিরে আসার পরিকল্পনা করেছিল। জাহাজের দেরি তাদের বাস টিকিট মিস করতে বাধ্য করেছে, ফলে পরের দিনের ভ্রমণসূচি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। একই সময়ে সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা কেফায়েত খান, যিনি ব্যবসায়িক কাজের জন্য দ্বীপে গিয়েছিলেন, জানান যে এশার সময় রওনা দিয়ে আট ঘণ্টা পরে কক্সবাজারে পৌঁছেছেন এবং শীতের তীব্রতায় সমুদ্রযাত্রা কষ্টকর হয়েছে। তিনি টেকনাফ বা ইনানী রুট ব্যবহার করলে সময় সাশ্রয় হতো বলে উল্লেখ করেন।
পর্যটন শিল্পের ওপর প্রভাব স্পষ্ট। হোটেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নুর জানান, আগে যেখানে মাত্র তিন ঘণ্টা লাগত, এখন একই দূরত্বে দশ থেকে বারো ঘণ্টা সময় লাগছে। অতিরিক্ত বিধিনিষেধ এবং জাহাজের চলাচলে দেরি পর্যটক প্রবাহে বড় ধাক্কা দিচ্ছে। তিনি ভবিষ্যতে দ্বীপবাসীর জন্য পর্যটন ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা ‘স্কোয়াব’এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন বাহাদুর ইসলাম জানান, এই মৌসুমে কুয়াশা ও নদীর প্রবাহের কারণে নাবিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে। কুয়াশা জাহাজের গতি কমিয়ে দেয় এবং বালু জমে যাওয়া ভাটায় আটকে যাওয়া সাধারণ ঘটনা। তিনি উল্লেখ করেন যে এই মৌসুমে জাহাজ চলাচল শুধুমাত্র দুই মাস (৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত) সীমাবদ্ধ, এবং এই সময়ে রাত্রিকালীন যাত্রার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিলম্বের মূল কারণ হিসেবে বাঙ্কখালী নদীর তীব্র কুয়াশা ও প্রবাহকে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাহাজগুলো রওনা হওয়ার অর্ধ ঘন্টার মধ্যেই মোহনা গাঁয়ের কাছে আটকে যায় এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা বেশি সময় নেয় গন্তব্যে পৌঁছাতে। এই পরিস্থিতি স্থানীয় নৌচালকদের জন্য চ্যালেঞ্জিং, কারণ নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সময় ও জ্বালানি ব্যয় হয়।
বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনের পর্যটন শিল্পের আয় মূলত মৌসুমী ভ্রমণ ও জাহাজ টিকিটের উপর নির্ভরশীল। বর্তমান দেরি ও অনিশ্চয়তা টিকিটের দাম বাড়িয়ে তুলতে পারে, তবে একই সঙ্গে পর্যটকের আগ্রহ কমে যাওয়ায় মোট আয় হ্রাসের ঝুঁকি রয়েছে। হোটেল ও রেস্টুরেন্টের দখল হার কমে যাওয়া, স্থানীয় বিক্রেতাদের বিক্রয় হ্রাস এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত ব্যয় করা পর্যটকদের সংখ্যা হ্রাস পাবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
দীর্ঘমেয়াদে, জাহাজ চলাচলের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে প্রযুক্তিগত আপগ্রেড এবং বিকল্প রুটের উন্নয়ন প্রয়োজন। টেকনাফ ও ইনানী রুটের ব্যবহার সময় সাশ্রয় করে এবং ঝুঁকি কমায়, যা ব্যবসায়িক ও পর্যটন সংস্থাগুলোর জন্য বিকল্প কৌশল হতে পারে। এছাড়া, মৌসুমের শেষের দিকে নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোর করা এবং রাত্রিকালীন যাত্রার জন্য যথাযথ আলোকসজ্জা ও নেভিগেশন সিস্টেম স্থাপন করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, সেন্টমার্টিনের জাহাজ চলাচলে বর্তমান দেরি পর্যটক ও স্থানীয় ব্যবসায়িকদের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি সৃষ্টি করেছে। কুয়াশা ও নদীর প্রবাহের প্রভাব কমাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিকল্প রুটের ব্যবহারই ভবিষ্যতে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ হবে।



