ময়মনসিংহের এক গ্রাম্য পথে ১৯৫৪ সালের গ্রীষ্মে এক কৃষক গমের ডাঁটা ভরা গাধার গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ বন্যা জলের চ্যানেল পার হতে বাধা পায়। গাড়ির চাকার নিচে জলে ভাসমান গমের গাঁথা ও গাধা দুজনই জোরে টানলেও গাড়ি অচল থাকে। গাড়ি চালক ও কৃষক দুজনই পানির মধ্যে পা দিয়ে গাড়ি উঁচু করার চেষ্টা করে, তবু গাড়ি না সরার দৃশ্যটি নায়েব উদ্দিন আহমেদ তার ক্যামেরায় বন্দী করেন।
এই মুহূর্তটি তখন দেশের নিম্নভূমি অঞ্চলে চলমান দুর্ভিক্ষের মাঝখানে ঘটেছিল, যেখানে কৃষকরা জীবিকা রক্ষার জন্য কঠিন সংগ্রাম করছিল। নায়েবের ছবিটি তৎকালীন শিল্পী শিলপাচার্য জাইনুল আবেদিনের নজরে পড়ে এবং তিনি ছবির গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা দ্বারা মুগ্ধ হন।
শিলপাচার্য আবেদিন নায়েবের কাছ থেকে ছবির একটি কপি চেয়ে নেন এবং তা ভিত্তি করে নিজের শিল্পকর্ম তৈরি করতে শুরু করেন। তিনি মূল দৃশ্যের রচনাকে সামান্য পরিবর্তন করে, ডিমের টেম্পরা, কালো কালি ও তেলরঙের মাধ্যমে নতুন রঙের ছোঁয়া যোগ করেন। এই পদ্ধতিতে তিনি দৃশ্যের গতিশীলতা ও রঙের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে তোলেন, ফলে গ্রাম্য জীবনের কঠিন সংগ্রামকে এক শাশ্বত শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করেন।
শিলপাচার্য এবং নায়েবের এই পারস্পরিক সৃষ্টিকর্ম দুটোই বাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্টকে চিত্রিত করে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসিকের মর্যাদা অর্জন করেছে। উভয় শিল্পীর কাজের মাধ্যমে গ্রাম্য দৃশ্যের বাস্তবতা ও মানবিক অনুভূতি একসাথে সংরক্ষিত হয়েছে।
নায়েব উদ্দিনের ফটোগ্রাফি ও নওয়েজ আহমেদের সহযোগিতায় তৈরি “বাংলাদেশ” শিরোনামের অ্যালবামটি সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে ঢাকা শহরের ইস্টার্ন রেগাল ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশনা ইংরেজি, ফরাসি ও জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে বাংলার গ্রামীণ জীবনের চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হয়।
অ্যালবামের মধ্যে নায়েবের কালো-সাদা ফটোগ্রাফি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা দেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য, কৃষক সমাজ এবং ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোকে নীরব কিন্তু শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করে। এই ছবিগুলো দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেয়।
শিলপাচার্য জাইনুল আবেদিনের শিল্পকর্মগুলো, যা নায়েবের ছবির অনুপ্রেরণায় তৈরি, তাতে তিনি ডিমের টেম্পরা, তেলরঙ এবং কালি ব্যবহার করে রঙের সমন্বয় ও রূপের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেন। তার কাজগুলোতে গ্রাম্য জীবনের তীব্রতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
এই শিল্পকর্মগুলো আজও বাংলাদেশের শিল্প জগতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বিভিন্ন জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়। শিল্পের মাধ্যমে নায়েবের ফটোগ্রাফিক দৃষ্টিকোণ ও শিলপাচার্যের চিত্রশৈলীর সমন্বয় একটি অনন্য ঐতিহাসিক সংযোগ গড়ে তুলেছে।
নায়েবের ক্যামেরা দিয়ে ধরা এই দৃশ্যটি শুধু একটি ফটোগ্রাফিক নথি নয়, বরং একটি সামাজিক বার্তা বহন করে। তাৎক্ষণিকভাবে গ্রাম্য মানুষের সংগ্রামকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে এবং পরবর্তীতে শিলপাচার্যের শিল্পকর্মের মাধ্যমে ঐ বার্তাটি আরও গভীরতা পেয়েছে।
শিলপাচার্য আবেদিনের কাজগুলোতে রঙের ব্যবহার ও রূপের গতি গ্রাম্য দৃশ্যকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে, যা দর্শকের মধ্যে সহানুভূতি ও প্রশংসা উত্থাপন করে। তার শিল্পকর্মগুলোতে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতির ছোঁয়া স্পষ্ট, যা দর্শকদেরকে অতীতের সঙ্গে সংযুক্ত করে।
১৯৫৪ সালের ঐ ফটোগ্রাফি এবং পরবর্তীতে শিলপাচার্যের শিল্পকর্মের সংযোগ বাংলাদেশের শিল্প ও ফটোগ্রাফি ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। উভয় শিল্পীর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে গ্রাম্য জীবনের বাস্তবতা, দুর্ভিক্ষের সময়ের কষ্ট এবং মানবিক দৃঢ়তা একসাথে সংরক্ষিত হয়েছে।
আজকের দিনে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোকে স্মরণ করা এবং সেগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নায়েব উদ্দিনের ফটোগ্রাফি এবং শিলপাচার্য জাইনুল আবেদিনের শিল্পকর্মের মাধ্যমে বাংলার গ্রামীণ জীবনের চিত্র আজও অনুপ্রেরণার উৎস এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে রয়ে গেছে।



