কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা, হ্নিলা ইউনিয়নের লেডা শিবির (ক্যাম্প‑২৪)‑এ গত রোববার রাত ১০ টার কাছাকাছি অগ্নিকাণ্ডে অন্তত পঞ্চাশটি শেল্টার সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে। স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মতে, আগুনটি রাত ১ টার দিকে চারটি দমকল ইউনিটের হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
লেডা শিবিরে প্রায় সত্তর হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করে। শিবিরের ঘরবাড়ি প্রধানত বাঁশ ও টার্পলিন দিয়ে তৈরি, এবং একে অপরের খুব কাছাকাছি স্থাপিত হওয়ায় অগ্নি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক তদন্তে শিবিরের কোনো বাসায় রান্নার চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাতের সম্ভাবনা দেখা গেছে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর উল্লেখ করেছেন, এই ঘটনার ফলে কোনো প্রাণহানি রিপোর্ট করা হয়নি। তবে শিবিরের ক্ষতির পরিমাণ ও পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণের জন্য বিস্তৃত তদন্ত চালু রয়েছে।
টেকনাফ‑১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার জানান, অগ্নিকাণ্ডটি আলিখালি ও লেডা শিবিরের মধ্যে সীমান্তে ঘটেছে। তিনি যোগ করেন, শিবিরের ব্লক‑এফ এবং ব্লক‑সি(এ) তে অবস্থিত বেশ কয়েকটি শেল্টার পুড়ে গেছে, তবে সম্পূর্ণ ক্ষতির হিসাব এখনো শেষ হয়নি।
শিবিরের সিআইসি (ক্যাম্প‑ইন‑চার্জ) আরও জানিয়েছেন, শিবিরের কিছু অংশে অগ্নি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, তবে এখনও ধ্বংসপ্রাপ্ত শেল্টারগুলোর পুনর্গঠন ও শরণার্থীদের অস্থায়ী আশ্রয় নিশ্চিত করার কাজ বাকি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই অগ্নিকাণ্ড রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার প্রশ্ন তোলার নতুন দিক উন্মোচন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংস্থা উল্লেখ করেছে, শিবিরের ঘনবসতিপূর্ণ কাঠামো ও অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমন দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ইউএন হাই কমিসনারের অফিসও শিবিরে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের আহ্বান জানিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা শিবিরের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের অংশ হিসেবে নিরাপদ বাসস্থান ও আগুন নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ জরুরি।
বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ঘটনা রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। সরকার ইতিমধ্যে শিবিরে অগ্নি প্রতিরোধক উপকরণ সরবরাহ ও দমকল ইউনিটের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা বিষয়ক চ্যালেঞ্জগুলো শুধুমাত্র মানবিক নয়, বরং কূটনৈতিকও। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ-রোহিঙ্গা বিষয়ক আলোচনায় শিবিরের নিরাপত্তা ও পুনর্নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
একজন আন্তর্জাতিক কূটনীতিকের মতে, রোহিঙ্গা শিবিরে ঘটিত অগ্নিকাণ্ডের পরিণতি দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে মানবিক সহায়তা ও শিবিরের অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়নে।
অবশ্যই, শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের পরবর্তী ধাপগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত শরণার্থীদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসা সেবা দ্রুত সরবরাহ করা জরুরি। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা দেশগুলোকে এই জরুরি চাহিদা মেটাতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, লেডা শিবিরে অগ্নিকাণ্ড রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে এবং তা সমাধানের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ত্বরিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে শিবিরের কাঠামোগত উন্নয়ন, অগ্নি প্রশমন ব্যবস্থা ও শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা কূটনৈতিক ও মানবিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।



