যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সোমবার ঘোষণা করেছে যে, আগামী বছর থেকে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা তহবিলে সর্বোচ্চ দুই বিলিয়ন ডলারই দেবে। এটি পূর্বের দশকে সর্বোচ্চ সতেরো বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস, এবং এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক সাহায্য নীতি পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইউএনের প্রধান তহবিলদাতা হিসেবে প্রায় আট থেকে দশ বিলিয়ন ডলার স্বেচ্ছা অবদান রেখেছে, তবে এখন এই পরিমাণকে মাত্র দুই বিলিয়নে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। সরকার এই কমিটমেন্টটি সোমবার প্রকাশ করেছে, যা পূর্বের অবদান থেকে প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি হ্রাসকে চিত্রিত করে।
এই তহবিল হ্রাসের ফলে বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ, শরণার্থী সংকট এবং মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মানবিক সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষত, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে সমালোচনাকারীরা মানবিক সহায়তার অভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে বলে সতর্ক করেছেন।
নতুন দুই বিলিয়ন ডলার একটি পুল তহবিল হিসেবে গঠন করা হবে, যা নির্দিষ্ট দেশ ও সংকটের জন্য ব্যবহার করা হবে। প্রাথমিকভাবে ১৭টি দেশকে লক্ষ্য করা হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কংগো, হাইতি, সিরিয়া এবং ইউক্রেন অন্তর্ভুক্ত। এই দেশগুলোতে চলমান সংঘাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তাত্ক্ষণিক সহায়তা প্রয়োজন।
অফগানিস্তান এবং ফিলিস্তিনকে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা সম্পন্ন হওয়ার পর অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দের সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে, তবে এখনো তা স্পষ্ট নয়।
ইউএন এই বছর ২০২৬ সালের জন্য ২৩ বিলিয়ন ডলারের তহবিল আহ্বান করেছে, যা প্রয়োজনীয় পরিমাণের অর্ধেক মাত্র। এই আহ্বানটি পশ্চিমা দেশগুলোর তহবিল হ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার জন্য বড় ফাঁক তৈরি করেছে।
ইউএন জুন মাসে সতর্ক করেছে যে, ঐতিহাসিক মাত্রার তহবিল কাটার ফলে প্রোগ্রামগুলোতে ব্যাপক হ্রাস ঘটতে পারে। তহবিলের ঘাটতি ‘সবচেয়ে গভীর’ কাটার শিরোনাম পেয়েছে, যা মানবিক সেবার গুণগত মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএডি (USAID) কে কার্যত অচল অবস্থায় নিয়ে এসেছে এবং ইউএন সংস্থাগুলোকে ‘অভিযোজন, সংকোচন অথবা মরণ’ করার আহ্বান জানিয়েছে। এই নীতি ইউএনের কার্যক্রমকে পুনর্গঠন বা সীমিত করার চাপ বাড়িয়ে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জার্মানি সহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোও তহবিল কমিয়ে দিচ্ছে। জার্মানির সাম্প্রতিক বাজেট সংশোধনে ইউএনের মানবিক প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বৈশ্বিক তহবিল সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকায় ইতিমধ্যে তহবিল হ্রাসের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শরণার্থী ক্যাম্প, স্বাস্থ্য সেবা এবং খাদ্য বিতরণে তহবিলের ঘাটতি সরাসরি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে।
ইউএন শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) জুলাই মাসে জানিয়েছে যে, প্রায় একাদশ মিলিয়ন শরণার্থী সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সংস্থাটি তার মোট বাজেটের মাত্র ২৩ শতাংশই পেয়েছে, যা ১০.৬ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য থেকে অনেক কম।
বাজেটের ঘাটতি বিবেচনা করে UNHCR মোট বাজেটকে মাত্র ৩.৫ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এই আর্থিক সংকট শরণার্থী ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি সহায়তা প্রদানকে কঠিন করে তুলবে।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল নীতি পুনর্বিবেচনা করা হবে কিনা, তা আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। তহবিলের পুনরায় বৃদ্ধি বা বিকল্প তহবিলের উৎস খোঁজা আন্তর্জাতিক সহায়তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হবে।



