বাংলাদেশে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকরা কর্মসংস্থান খুঁজতে গিয়ে প্রায় তৃতীয়াংশেরও বেশি সময় পর্যন্ত বেকার ছিলেন। শ্রমশক্তি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ২৬.২৪ লক্ষ মানুষ বেকার, যার মধ্যে ৮.৮৫ লক্ষ স্নাতক। এদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩৩%) দুই বছর পর্যন্ত কাজ না পেয়ে রইলেন, আর তাদের মধ্যে এক সপ্তমাংশ (প্রায় ১৪%) এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বেকার ছিলেন। অন্যদিকে, এক ছয় ভাগেরও বেশি (প্রায় ১৬%) দুই বছরের বেশি সময় বেকারত্বে কাটিয়েছেন।
এই তথ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত শ্রমশক্তি সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত, যা এই মাসে প্রকাশিত হয়েছে। সমীক্ষা কর্মসংস্থান বাজারের সামগ্রিক অবস্থা, চাকরি অনুসন্ধানের পদ্ধতি এবং বেকারত্বের সময়কাল ইত্যাদি বিশদভাবে তুলে ধরেছে।
বেকার তরুণ প্রার্থীদের চাকরি পাওয়ার পদ্ধতি নিয়ে দেখা যায়, প্রায় ত্রিশ ছয় শতাংশ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে কাজের সন্ধান করেন। বিজ্ঞাপন মাধ্যমে আবেদন করা প্রার্থীর হার ২৬ শতাংশ, আর ১২ শতাংশ সরাসরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে আবেদন করেন। তাছাড়া, ৯ শতাংশ প্রার্থি সরাসরি সংস্থার কাছে আবেদনপত্র পাঠিয়ে সুযোগের অপেক্ষা করেন। বিজ্ঞাপন দেখার পরই আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রার্থীর সংখ্যা ৫.৫ শতাংশ, আর ৩.৫ শতাংশ প্রার্থী সরাসরি কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে চাকরি পেতে চেয়েছেন।
অভিজ্ঞ শ্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, স্নাতকদের এক তৃতীয়াংশের বেকারত্ব দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ সময়ের বেকারত্ব তরুণদের ক্যারিয়ারে “দাগ” রেখে যায়; এক থেকে দুই বছর দেরিতে চাকরি শুরু করা ব্যক্তিরা পুরো কর্মজীবনে পিছিয়ে থাকতে পারেন। এই পরিস্থিতি মানবসম্পদ ও দক্ষতার অপচয় ঘটায়, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর।
একজন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রাক্তন বিশেষ উপদেষ্টা রিজওয়ানুল ইসলাম উল্লেখ করেন, দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্ব ছয় মাসের পরই উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, এই অবস্থা দক্ষতার অপ্রয়োগ এবং সম্পদের অদক্ষ বণ্টনের দিকে নিয়ে যায়, যা শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করে। এছাড়া, চাকরি পরিবর্তনের প্রক্রিয়াই নিজেই বেকারত্বকে বাড়িয়ে তুলতে পারে, কারণ কর্মসংস্থান পরিবর্তনের কাঠামোই দীর্ঘ সময়ের বেকারত্বের একটি কারণ।
বিবিএসের এই সমীক্ষা দেশের শ্রমবাজারের বর্তমান অবস্থা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে এবং নীতি নির্ধারকদের জন্য জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসংস্থান প্রকল্প, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং নেটওয়ার্কিং সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বেকারত্বের সমস্যার সমাধানে পরিবার ও বন্ধুদের নেটওয়ার্কের ব্যবহার এখনও প্রধান, তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও বিজ্ঞাপন মাধ্যমে আবেদন করার হারও উল্লেখযোগ্য। এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, তরুণ প্রার্থীদের জন্য অনলাইন চাকরি পোর্টাল ও ক্যারিয়ার সেন্টারের কার্যকারিতা বাড়ানো উচিত।
শেষে, যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ বেকারত্বের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, তবে আত্মীয়-স্বজনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার পাশাপাশি নিয়মিতভাবে অনলাইন চাকরি বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণ, সরাসরি প্রতিষ্ঠানকে আবেদন করা এবং ক্যারিয়ার পরামর্শদাতার সাহায্য নেওয়া কার্যকর হতে পারে। আপনার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সঠিক পথ বেছে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্ব এড়াতে সহায়ক হবে।



