বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া আরব ও ফার্সি শিলালিপি, মধ্যযুগীয় ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই লিপিগুলো প্রথম শতাব্দীর শেষের দিকে মুসলিম শাসনের সূচনা থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিহাস ও সংস্কৃতি পাঠের মূল উপাদান হিসেবে কাজ করে।
শিলালিপি শুধু নান্দনিক দিক থেকে নয়, ভাষাতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও সমৃদ্ধ। আরব ও ফার্সি শব্দের ব্যবহার, তিলক ও কোরআনের আয়াতের নকশা, এবং স্থানীয় শৈলীর মিশ্রণ এই লিপিগুলোকে অনন্য করে তুলেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রাচীন লেখনী বিশ্লেষণ করে ভাষার বিকাশ ও ধর্মীয় পরিবর্তন বুঝতে পারে।
বাংলাদেশের মুসলিম জনসংখ্যা, বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাংলা‑ভাষী মুসলিম গোষ্ঠী, এই শিলালিপির মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের প্রবেশ ও বিস্তার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায়। লিপিগুলোতে উল্লেখিত শাসক, যুদ্ধ, দান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত, যা পাঠ্যপুস্তকে পাওয়া তথ্যকে সমৃদ্ধ করে।
ইস্লামিক শিলালিপি বিজ্ঞান, অর্থাৎ এপিগ্রাফি,ের সূচনা ১৫শ শতাব্দীর শুরুর দিকে জামালউদ্দিন শিবি নামের এক পণ্ডিতের কাজ থেকে বলা হয়। তিনি মক্কায় অবস্থিত বিখ্যাত বাংলা সেমিনারিতে অধ্যয়ন চালিয়ে শিলালিপির পদ্ধতি ও বিশ্লেষণ পদ্ধতি গড়ে তোলেন। তার গবেষণা দেখায় কীভাবে এই লিপিগুলো পুরাতন বিশ্বের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতায় ফাঁক পূরণ করে এবং মধ্যযুগীয় ইসলামের বৈশ্বিকীকরণে অবদান রাখে।
বেঙ্গল অঞ্চলে আরব‑ফার্সি শিলালিপির প্রচলন তৃতীয় মুসলিম শাসক সুলতান আলা‑দীন (আলি মর্দান) খলজীর শাসনকালে শুরু হয়। ১৩শ শতাব্দীর শুরুর দিকে, তার বিজয়ের পর প্রথম ফার্সি শিলালিপি তৈরি হয়, যা শাসকের ক্ষমতা ও ধর্মীয় নীতি প্রকাশ করে। এই লিপি থেকে জানা যায়, শাসকরা ফার্সি ভাষাকে সরকারি ও সাংস্কৃতিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতেন।
এরপরের খলজি শাসক বালকা খান খলজি (৬২৬‑৬২৮ হিজরি / ১২২৯‑১২৩০ খ্রি.) সময়েও অনুরূপ ফার্সি শিলালিপি তৈরি হয়। উভয় লিপি থেকে স্পষ্ট হয় যে, শাসক বর্গের কাছ থেকে ফার্সি ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা শুরুর থেকেই বিদ্যমান ছিল, যা ভাষা ও সংস্কৃতির মিশ্রণকে উত্সাহিত করেছিল।
মহদিপুর গ্রাম, গৌর নগরের নিকটবর্তী একটি প্রাচীন মসজিদে আবিষ্কৃত নিম দরজা শিলালিপি, আরব লিপির অন্যতম উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই লিপিতে সুলতানীয় দরজার নাম ও নির্মাণের তারিখ উল্লেখ আছে, যা গৌরের সুলতানী প্রাসাদের দুইটি বিশাল প্রবেশদ্বারকে সজ্জিত করেছিল। এর নকশা ও ক্যালিগ্রাফি শৈলী বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত, এবং শিক্ষার্থীদের জন্য লিপি বিশ্লেষণের আদর্শ উদাহরণ।
চাঁদ দরজা শিলালিপি, আরেকটি আরব লিপি, একই সময়ে গৌরের প্রাসাদের প্রবেশদ্বারকে সজ্জিত করেছিল। উভয় দরজা একসঙ্গে গৌরের রাজকীয় স্থাপত্যের মহিমা ও ধর্মীয় গুরুত্বকে প্রকাশ করত। এই লিপিগুলো আজও গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, যা মধ্যযুগীয় সুলতানী নগরের নগর পরিকল্পনা ও ধর্মীয় নীতি সম্পর্কে বিশদ তথ্য দেয়।
উনবিংশ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক সময়ে ইউরোপীয় সংগ্রাহকরা এই শিলালিপিগুলোকে নিজের দেশে নিয়ে যান। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ সৈনিক কলোনেল ফ্র্যাঙ্কলিন গৌরের চাঁদ দরজা শিলালিপি সহ বেশ কয়েকটি আরব লিপি ইংল্যান্ডের নিজস্ব বাড়িতে স্থানান্তর করেন। এই ধরনের স্থানান্তর শিলালিপির মূল পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।
শিলালিপির এই ঐতিহাসিক ক্ষতি সত্ত্বেও, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রগুলো লিপি রক্ষণাবেক্ষণ, ডিজিটাল আর্কাইভিং এবং শিক্ষামূলক কর্মশালার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে এই ধনসম্পদ সম্পর্কে সচেতন করছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে শিলালিপি ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীরা ইতিহাসের বাস্তব সাক্ষ্য থেকে সরাসরি শিখতে পারে, তত্ত্বের পরিবর্তে প্রমাণভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করে। তাই পাঠ্যক্রমে শিলালিপি বিশ্লেষণ, ফিল্ড ট্রিপ এবং ডিজিটাল মডেলিং অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
আপনার বিদ্যালয় বা কলেজে যদি কোনো শিলালিপি সংরক্ষণ প্রকল্প না থাকে, তবে স্থানীয় ঐতিহাসিক সাইটে ফিল্ড ভিজিটের পরিকল্পনা করুন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লিপির অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করার অনুশীলন করুন। এই অভিজ্ঞতা তাদের গবেষণা দক্ষতা বাড়াবে এবং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গর্বের অনুভূতি জাগাবে।



