অধিকাংশ দেশের মতোই বাংলাদেশে দারিদ্র্য পুনরায় বাড়ছে, আর এই প্রবণতা কর্মসংস্থানহীনতা, শিক্ষার মানের হ্রাস এবং লিঙ্গ বৈষম্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। গতকাল অনলাইনভাবে অনুষ্ঠিত “আজকের এজেন্ডা: বাংলাদেশে দারিদ্র্য উল্টে যাওয়ার কারণ কী?” শিরোনামের আলোচনায় এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে তীব্র আলোচনা হয়।
ইভেন্টটি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (PPRC) আয়োজন করে, যেখানে নীতি নির্ধারক, গবেষক এবং সমাজসেবী ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা একমত যে, মধ্যবর্তী সরকারকে ত্বরিত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা দারিদ্র্যের প্রবণতা আরও গভীর হবে।
একজন বিশিষ্ট নীতি বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, দারিদ্র্যের উল্টো প্রবণতা কোনো একক ঘটনার ফল নয়; এটি একাধিক শক—যেমন বৈশ্বিক মন্দা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কাঠামোগত দুর্বলতা—এর সমন্বয়। দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য হ্রাসের নীতি মূলত মানুষকে দারিদ্র্য সীমার উপরে টেনে আনার দিকে মনোযোগ দিয়েছে, কিন্তু স্থায়ী মুক্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
পিপিআরসি’র সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, গত তিন বছরে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের শেয়ার ৫.৬ শতাংশ থেকে ৯.৩৫ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মানে, এখন প্রতি চারজনের মধ্যে একজন দারিদ্র্যের সীমার নিচে বসবাস করছেন, যা পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
কর্মসংস্থানহীনতার হারও সমান্তরালভাবে বাড়ছে। তরুণ বেকারত্বের হার উচ্চমাত্রায় স্থায়ী হয়েছে, ফলে পরিবারিক আয় কমে গিয়ে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে, শিক্ষার ফলাফল হ্রাস পেয়েছে; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ফলাফল হ্রাসের প্রবণতা দেখা যায়, যা ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির গুণগত মানকে প্রভাবিত করবে।
লিঙ্গ বৈষম্যও দারিদ্র্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। নারীদের কর্মসংস্থানের হার পুরুষের তুলনায় কম, এবং শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের হারও এখনও সমান নয়। এই পার্থক্যগুলো পরিবারিক আয়কে সীমিত করে, ফলে নারীর নেতৃত্বে গৃহস্থালির দারিদ্র্য ঝুঁকি বাড়ে।
দারিদ্র্যের এই দ্বৈত সঙ্কট—অস্থায়ী দারিদ্র্য এবং দীর্ঘস্থায়ী চরম দারিদ্র্য—একই সঙ্গে মোকাবেলা করা প্রয়োজন। নীতি নির্ধারকদের জন্য জরুরি বিষয় হল, দারিদ্র্য হ্রাসের প্রচলিত পদ্ধতিকে পুনর্বিবেচনা করে, লক্ষ্যভিত্তিক ও সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা।
বিশেষজ্ঞরা বর্তমান সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরনো, বিচ্ছিন্ন এবং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সমালোচনা করেন। তারা দাবি করেন, নতুন প্রজন্মের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা যত্ন-প্রতিক্রিয়াশীল, শক-প্রতিরোধী এবং নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
এধরনের রূপান্তরকে কার্যকর করতে বৃহৎ পরিসরের, বিশদভিত্তিক জরিপের প্রয়োজন, যাতে নীতি নির্ধারকরা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা করতে পারেন। জরিপের ফলাফল থেকে অঞ্চলভিত্তিক দারিদ্র্যের মাত্রা, কর্মসংস্থান সুযোগ এবং শিক্ষার প্রবেশের বাধা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, দারিদ্র্যের বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষার মানের অবনতি একে অপরকে বাড়িয়ে দেয়। দারিদ্র্যগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রায়শই সন্তানদের স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকে, ফলে শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানহীনতা বাড়ে। তাই, দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার প্রবেশ ও গুণগত মান উন্নয়নকে সমান্তরালভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পাঠক হিসেবে আপনি কি আপনার পারিপার্শ্বিক এলাকায় দারিদ্র্য ও শিক্ষার সমস্যার সূচকগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন? স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা স্কুলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছোটখাটো সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে। একসাথে কাজ করলে দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা সম্ভব, তাই আপনার মতামত ও উদ্যোগ শেয়ার করুন।



