কাঠমাণ্ডু শহরের মেয়র এবং প্রাক্তন র্যাপার বালেন্দ্র শা (ব্যালেন) রাষ্ট্রীয় স্বাধীন পার্টি (RSP) এর প্রতিষ্ঠাতা রবি লামিচহানে সঙ্গে চুক্তি করে, মার্চ ৫ তারিখে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে জয়লাভের শর্তে শা প্রধানমন্ত্রী হবেন, লামিচহানে পার্টির প্রধান পদে থাকবেন। এই চুক্তি দুই পক্ষের সমর্থককে একত্রিত করে, বিশেষত যুবকদের ভোটার ভিত্তি শক্তিশালী করতে লক্ষ্য রাখে।
বালেন্দ্র শা, যিনি ৩৫ বছর বয়সী, গত সেপ্টেম্বরের ‘জেন জেড’ আন্দোলনের সময় যুবকদের অগ্রণী নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। সেই প্রতিবাদে ব্যাপক দুর্নীতির বিরোধিতা করা হয় এবং ৭৭ জনের মৃত্যু ঘটার পর প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলির পদত্যাগের দিকে ধাবিত হয়। শা ও লামিচহান উভয়ই এই আন্দোলনের দাবি পূরণে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় স্বাধীন পার্টি ২০২২ সালের নির্বাচনের পূর্বে লামিচহান প্রতিষ্ঠা করেন; তিনি টেলিভিশন হোস্ট থেকে রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত হয়েছেন এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। শা ও লামিচহানের এই জোট ঐতিহ্যবাহী পার্টিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেগুলো তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নেপালের রাজনীতিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিশ্লেষক বিপিন অধিকারী উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় স্বাধীন পার্টির জন্য শা ও তার তরুণ সমর্থকদের অন্তর্ভুক্ত করা কৌশলগতভাবে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী পার্টিগুলো তাদের যুব ভোটার হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। এই বিশ্লেষণটি বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন শক্তির উত্থানকে তুলে ধরে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের মোট ৩০ মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১৯ মিলিয়ন ভোটার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। সেপ্টেম্বরের প্রতিবাদ পরবর্তী সময়ে প্রায় এক মিলিয়ন নতুন ভোটার, প্রধানত যুবক, তালিকাভুক্ত হয়েছে, যা ভোটার ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
প্রতিবাদের পর শা জনসাধারণের দৃষ্টিতে উঠে আসে, যদিও তার ভূমিকা নিয়ে কিছু সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকরা দাবি করেন, শা প্রতিবাদে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না এবং প্রধানত সামাজিক মিডিয়ার মাধ্যমে সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তবু তার জনপ্রিয়তা এবং যুবকদের সমর্থন তাকে রাজনৈতিক মঞ্চে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
শা এছাড়া প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশিলা কার্কির গঠন করা অন্তর্বর্তী সরকারে অংশগ্রহণ করেন, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকবে। এই সরকারে শা তার প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনসেবার অভিজ্ঞতা প্রদর্শন করার সুযোগ পেয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর পদে শা ও লামিচহানের সম্ভাব্য জয় নেপালের ঐতিহ্যবাহী দুই বড় পার্টি—কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফাইড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট) এবং নেপালি কংগ্রেস—কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে। এই দুই পার্টি গত তিন দশকে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে আসছে এবং শা ও লামিচহানের জোট তাদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য যে, শা এবং লামিচহান উভয়ই জনমত গঠনে সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। শা বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। লামিচহানও তার টেলিভিশন ক্যারিয়ার থেকে অর্জিত যোগাযোগ দক্ষতা ব্যবহার করে পার্টির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
প্রতিবাদে নিহত ৭৭ জনের শোকের সঙ্গে সঙ্গে নেপালের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন দিকনির্দেশের সূচনা হতে পারে। শা ও লামিচহানের চুক্তি যদি নির্বাচনে সফল হয়, তবে নেপালের শাসন কাঠামোতে প্রথমবারের মতো যুবক প্রধানমন্ত্রীর শাসন দেখা যাবে।
অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী পার্টিগুলো তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে পারে। তারা যুব ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নীতি পরিবর্তন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি মোকাবেলায় নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্চ ৫ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সংসদীয় নির্বাচন নেপালের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হবে। শা ও লামিচহানের জোটের পারফরম্যান্স, নতুন যোগ হওয়া এক মিলিয়ন যুব ভোটার এবং প্রতিবাদে উত্থাপিত দাবি সবই নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলবে। নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে দেখছেন।



