মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ার ফলে দৈনন্দিন পণ্যের দামও তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে নতুন বছরের সূচনায় আর্থিক পরিকল্পনা না থাকলে সঞ্চয় কমে যায় এবং ঋণগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, সঠিক বাজেটিং এবং খরচের উপর নিয়ন্ত্রণ গৃহস্থালির আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
প্রথম ধাপ হিসেবে বছরের শুরুতেই মাসিক বাজেট নির্ধারণ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, যদি মাসিক আয় পঞ্চাশ হাজার টাকা হয়, তবে বাসা ভাড়া, খাবার, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসা ইত্যাদি খাতে প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে লিখে রাখলে অপ্রত্যাশিত ব্যয় এড়ানো সহজ হয়। লিখিত পরিকল্পনা হঠাৎ খরচে অতিরিক্ত ব্যয় হওয়া থেকে রোধ করে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
দ্বিতীয়ত, আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। একই উদাহরণে, যদি মোট আয় পঞ্চাশ হাজার টাকা হয়, তবে সর্বোচ্চ চুয়াল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা ব্যয় সীমা নির্ধারণ করে বাকি অংশ সঞ্চয়ের জন্য আলাদা রাখা উচিত। এভাবে মাসের শেষে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমে এবং আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ে।
তৃতীয় ধাপ হল প্রয়োজনীয় ব্যয় এবং অবসর ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য করা। বাসা ভাড়া, খাবার, সন্তানদের শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা প্রথমে পূরণ করা উচিত, আর নতুন ফোন বা ব্র্যান্ডেড পোশাকের মতো অবসর ব্যয় পরে বিবেচনা করা যায়। এই বিভাজন ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা করে এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমায়।
চতুর্থ কৌশল হিসেবে, মাসের শুরুতেই নির্দিষ্ট পরিমাণ সঞ্চয় করা গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচ হাজার টাকা আলাদা সঞ্চয় হিসাবের মধ্যে রাখলে বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ব্যয় থেকে আলাদা হয়, ফলে অপ্রয়োজনীয় খরচে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে। ধারাবাহিক সঞ্চয় সময়ের সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জমে এবং আর্থিক আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
পঞ্চম পদক্ষেপে জরুরি ব্যয়ের জন্য আলাদা তহবিল গঠন করা সুপারিশ করা হয়। হঠাৎ অসুস্থতা বা অপ্রত্যাশিত ভ্রমণের জন্য দুই-তিন মাসের গড় ব্যয়ের সমান অর্থ সঞ্চয় করলে ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন কমে এবং আর্থিক চাপ হ্রাস পায়। এই ধরনের জরুরি তহবিল আর্থিক ঝুঁকি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ষষ্ঠ কৌশল হল উচ্চ সুদের ঋণ আগে পরিশোধ করা। একাধিক ঋণ থাকলে, যেটিতে সুদের হার বেশি, সেটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিশোধ করলে মোট ব্যয় কমে এবং ঋণদাতার সঙ্গে সম্পর্কও সুদৃঢ় হয়। উদাহরণস্বরূপ, মোবাইল ফোন বা ফ্রিজের কিস্তি ঋণ যদি উচ্চ সুদে থাকে, তবে তা আগে শোধ করলে ভবিষ্যতে কম সুদ পরিশোধ করতে হবে।
সপ্তম পদ্ধতি হিসেবে দৈনিক ব্যয় রেকর্ড রাখা প্রয়োজন। চা-নাশতা, রিকশা ভাড়া বা ছোটখাটো কেনাকাটা যাই হোক, প্রতিদিনের ব্যয় লিখে রাখলে মাসের শেষে মোট ব্যয় কত হয়েছে তা স্পষ্ট হয়। এই রেকর্ডের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করে সেগুলি কমানোর পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
অষ্টম কৌশল হল বিল এবং সাবস্ক্রিপশন পরিষেবার পুনর্মূল্যায়ন। এমন সেবা যা ব্যবহার না করেও মাসিক ফি ধারাবাহিকভাবে কাটছে, সেগুলি বাতিল করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, বাড়িতে স্মার্ট টিভি চালু রেখে অতিরিক্ত ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যবহার করা হলে তা অপ্রয়োজনীয় খরচে পরিণত হয়। সেবা পুনরায় মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী পরিকল্পনা পরিবর্তন করলে ব্যয় কমে।
এই আটটি পদ্ধতি বাস্তবায়ন করলে নতুন বছরের আর্থিক পরিকল্পনা আরও দৃঢ় হবে এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব কমে যাবে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, বাজেটের ধারাবাহিক অনুসরণ, সঞ্চয়ের অভ্যাস এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা একসাথে করলে পরিবারের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও, এই কৌশলগুলো অনুসরণ করলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্ভব হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয় বাড়বে।
সারসংক্ষেপে, নতুন বছরের আর্থিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাজেট নির্ধারণ, আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য, প্রয়োজনীয় ও অবসর ব্যয়ের পার্থক্য, সঞ্চয় ও জরুরি তহবিল গঠন, উচ্চ সুদের ঋণ শোধ, দৈনিক ব্যয় রেকর্ড এবং বিলের পুনর্মূল্যায়ন—এই মূল বিষয়গুলো মেনে চলা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলোকে দৈনন্দিন জীবনে সংযোজিত করলে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় প্রস্তুত থাকা সম্ভব হবে।



