দ্য ইকোনমিস্ট ২০২৫ সালের সেরা সিইও পুরস্কার ঘোষণার সঙ্গে রাইনমেটাল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী আরমিন পাপারগার নামটি শীর্ষে উঠে এসেছে। নির্বাচনের ভিত্তি ছিল শেয়ারহোল্ডার রিটার্ন, যা S&P 1200 সূচকের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর গড় পারফরম্যান্সের তুলনায় বেশি। পাপারগার ২০১৩ সাল থেকে দায়িত্বে আছেন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পে তার কৌশলগত পদক্ষেপগুলোকে মূলধন বৃদ্ধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ বছরটি বৈশ্বিক কর্পোরেট পরিবেশে অস্থিরতা ও চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচন নতুন বাণিজ্য নীতি ও ট্যাক্স সংস্কারকে ত্বরান্বিত করে, ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যযুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তিগত আধিপত্যের লড়াই তীব্রতর হয়, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে উচ্চ প্রত্যাশা সত্ত্বেও অনেক কোম্পানি লাভজনক মডেল গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।
এই অনিশ্চয়তার মাঝেও কয়েকজন সিইও তাদের নেতৃত্বের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ফলাফল অর্জন করেন। দ্য ইকোনমিস্টের মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী, S&P 1200 সূচকের অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজস্ব শিল্পের গড় রিটার্নের তুলনায় বেশি শেয়ারহোল্ডার রিটার্ন প্রদানকারী সিইওদের ভিত্তিতে র্যাঙ্ক করা হয়। তিন বছরের কম সময়ের সিইওদের বিবেচনা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং প্রাথমিকভাবে শীর্ষ দশজনের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
তালিকায় ছিলেন রাইনমেটালের আরমিন পাপারগার, নিউমন্টের টম পামার, ফুজিকুরার ওকাদা নাওকি, ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভেরি’র ডেভিড জাসলাভ, হানহা অ্যারোস্পেসের সন জে ইল, মাইক্রনের সঞ্জয় মেহরোত্রা, কিনরস গোল্ডের জে পল রোলিনসন, রবিনহুডের ভ্লাদিমির টেনেভ, এসকে হাইনিক্সের কাক নো জং এবং সিগেট টেকনোলজির ডেভ মসলে। এই দশজনের মধ্যে প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট শিল্পে শেয়ারহোল্ডার রিটার্নের ক্ষেত্রে গড়ের উপরে পারফরম্যান্স ছিল।
তবে শীর্ষ দশের মধ্যে কিছু নাম চূড়ান্ত নির্বাচনের তালিকা থেকে বাদ পড়ে। বাদ পড়ার কারণের মধ্যে অতীতের দুর্বল পারফরম্যান্স, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীলতা উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নিউমন্টের শেয়ারদর স্বর্ণের দামের ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তবে এই বৃদ্ধি সরাসরি সিইও টম পামারের কৃতিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়নি।
সেইসাথে মেমোরি চিপ বাজারে AI বুমের সুবিধা সত্ত্বেও, এসকে হাইনিক্সের গবেষণা ও উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগকে বিশেষভাবে প্রশংসা করা হয়েছে। কাক নো জংের নেতৃত্বে কোম্পানি নতুন প্রোডাক্ট লাইন চালু করে এবং ইউরোপীয় ও এশীয় বাজারে শেয়ার বৃদ্ধি করেছে, যা শেয়ারহোল্ডার রিটার্নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
রাইনমেটালের পাপারগারকে সেরা সিইও হিসেবে চিহ্নিত করার মূল কারণ ছিল শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১৫৮ শতাংশ রিটার্ন অর্জন, যার মধ্যে লভ্যাংশও অন্তর্ভুক্ত। এই রিটার্নের পেছনে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একাধিক বড় চুক্তি সই করা এবং নৌযান নির্মাণ খাতে সম্প্রসারণের কৌশল রয়েছে। পাপারগার কোম্পানির পোর্টফোলিওকে ঐতিহ্যবাহী অস্ত্র উৎপাদন থেকে আধুনিক ডিফেন্স সিস্টেম ও সামুদ্রিক প্রকল্পে বিস্তৃত করেছেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রাইনমেটালের শেয়ারহোল্ডার রিটার্নের বৃদ্ধি শুধুমাত্র বাজারের সামগ্রিক প্রবণতার ফল নয়, বরং পাপারগারের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশলের ফল। তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের পূর্বে ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা শুরু করেন, যা যুদ্ধের পর দ্রুত চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
২০২৫ সালের ব্যবসা পরিবেশে AI এবং ডিফেন্স সেক্টরের পারস্পরিক প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। AI প্রযুক্তি মেমোরি চিপের চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে, যা SK Hynix এবং মাইক্রনের মতো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার রিটার্নকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। অন্যদিকে, স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির ফলে মাইনিং কোম্পানিগুলো স্বল্পমেয়াদে লাভবান হলেও, শেয়ারহোল্ডার রিটার্নের স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে তা সীমিত বলে বিবেচিত হয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্টের নির্বাচন প্রক্রিয়া ভবিষ্যৎ সিইওদের জন্য একটি মানদণ্ড স্থাপন করেছে। শেয়ারহোল্ডার রিটার্নকে প্রধান মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে, কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী মূল্য সৃষ্টিতে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে এই পদ্ধতি শুধুমাত্র আর্থিক রিটার্নের ওপর জোর দেয়, তাই সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পরিবেশগত প্রভাবের মতো অ-আর্থিক সূচকগুলোকে উপেক্ষা করা হতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা হিসেবে, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং AI চালিত প্রযুক্তি শিল্পের সম্প্রসারণ রাইনমেটাল এবং SK Hynixের মতো কোম্পানির জন্য সুযোগ তৈরি করবে। তবে বাণিজ্য নীতি পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা ঝুঁকি হিসেবে রয়ে যাবে। সিইওদের জন্য এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কৌশলগত নমনীয়তা এবং উদ্ভাবনী বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালের সেরা সিইও হিসেবে আরমিন পাপারগারকে বেছে নেওয়া তার নেতৃত্বে রাইনমেটালের শেয়ারহোল্ডার রিটার্নের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা বাজারে সফল চুক্তি এবং নৌযান শিল্পে সম্প্রসারণের ফলাফলকে স্বীকৃতি দেয়। তার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা কোম্পানিটিকে অস্থির বৈশ্বিক পরিবেশে স্থিতিশীলভাবে বৃদ্ধি পেতে সহায়তা করেছে। এই নির্বাচন অন্যান্য সিইওদের জন্য শেয়ারহোল্ডার রিটার্নের পাশাপাশি শিল্পের গঠনমূলক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নেতৃত্বের গুরুত্বকে তুলে ধরে।



