হাল শহরের বাসিন্দা কার্ল বুশবির ২৭ বছর আগে শুরু করা বিশ্বব্যাপী পদযাত্রা শেষের পথে। ১ নভেম্বর ১৯৯৮ তারিখে চিলি থেকে রওনা হয়ে ৩৬,০০০ মাইল (৫৮,০০০ কিলোমিটার) পায়ে পায়ে অতিক্রম করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি কোনো পরিবহন ব্যবহার না করে ঘরে ফিরে আসার পরিকল্পনা করেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হালের সাটন পার্কে তার মা, ৭৫ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেলা বুশবির, অপেক্ষা করছেন।
কার্লের এই যাত্রা মূলত নিজের সীমা পরীক্ষা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতি অন্বেষণের উদ্দেশ্যে শুরু হয়। তিনি পূর্বে প্যারাট্রুপার হিসেবে সেবা করেছেন এবং পরবর্তীতে একা পায়ে পায়ে বিশ্ব ভ্রমণকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো পথটি সম্পন্ন করতে প্রায় বারো বছর সময় লাগবে।
প্রথম পদক্ষেপে তিনি দক্ষিণ আমেরিকার চিলি থেকে হাল পর্যন্ত পায়ে পায়ে অগ্রসর হন। পথে তিনি বিভিন্ন দেশ পার করে, কখনো কখনো কঠিন ভূখণ্ড ও শীতল জলবায়ু মোকাবিলা করেন। তবে কোনো যানবাহন ব্যবহার না করার শর্তে ভ্রমণ চালিয়ে যাওয়ায় ভিসা, সীমান্ত বন্ধ এবং রাজনৈতিক অশান্তি তার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ, কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ভিসা প্রাপ্তিতে জটিলতা তার পরিকল্পনাকে বারবার পিছিয়ে দেয়। ফলে, মূল ১২ বছরের সময়সীমা অতিক্রম করে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৮ বছর কেটে গেছে। তবু তিনি অটলভাবে পথ চলতে থাকেন এবং সম্প্রতি অস্ট্রিয়ার সীমানা অতিক্রমের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অস্ট্রিয়া পার হয়ে হাল ফিরে আসার পথে, তার পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলনের প্রস্তুতি চলছে। হালের সাটন পার্কে অবস্থিত তার শৈশবের বাড়িতে, অ্যাঞ্জেলা বুশবির তার ছেলের প্রত্যাবর্তনের জন্য ঘর সাজিয়ে রেখেছেন। ঘরের দেয়ালে পুরনো ফটো এবং স্মৃতিচিহ্ন ভরা, যা তার দীর্ঘ যাত্রার সাক্ষী।
অ্যাঞ্জেলা, যিনি আগে স্ন্যাক ফুড ফ্যাক্টরিতে প্যাকার হিসেবে কাজ করতেন, এখন অবসরপ্রাপ্ত এবং তার স্বামী কিথ, যিনি প্রাক্তন এসএএস সৈনিক, থেকে বিচ্ছিন্ন। তিনি বলেন, “আমি এখানে থাকব, চ্যানেল টানেল নয়, হালের গেটের সামনে তোমার জন্য অপেক্ষা করব।” তার মুখে সন্তানের জন্য গর্বের ছাপ স্পষ্ট, যদিও দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছেদ তাকে নিদ্রাহীন রাত্রি দিয়েছে।
১৯৯৮ থেকে এখন পর্যন্ত তার ছেলেকে মাত্র তিনবার দেখা হয়েছে, যার মধ্যে একটি ২০০৬ সালে বেরিং সমুদ্রপথের বরফে ঢাকা অংশ পা দিয়ে অতিক্রমের সময়। সেই মুহূর্তে তিনি প্রথম ব্রিটিশ হিসেবে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করেন, যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়।
অ্যাঞ্জেলা তার ছেলের এই দীর্ঘ যাত্রা নিয়ে বলেন, “সে আমাকে অনেক রাত জাগিয়ে রেখেছে, আমি অবাক হয়ে ভাবি কেন আমি এতটা ধৈর্য্য ধরতে পারি।” তিনি যোগ করেন, “সে এখনও আমার ছোট্ট ছেলে, মা হিসেবে তা বদলায় না, সে যাই করুক না কেন।” এই অনুভূতি স্থানীয় মানুষের হৃদয়েও অনুরণিত হয়েছে।
গোলিয়াথ এক্সপেডিশন নামে পরিচিত এই পদযাত্রা তার পিতার সমর্থনে শুরু হয়। কিথ বুশবির, যিনি পূর্বে এসএএস-এ সেবা করেছেন, তার ছেলেকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা প্রদান করেন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বিশ্বকে পায়ে পায়ে অতিক্রম করে হালের মাটিতে ফিরে আসা, যা একটি অনন্য মানবিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত।
অ্যাঞ্জেলা বুশবির তার ছেলের পরিকল্পনা শোনার সময় বিস্ময় প্রকাশ করেন, “আমি তার পরিকল্পনা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।” তিনি অতীতের কঠিন সময়গুলোকে স্মরণ করে বলেন, “কার্ল সবসময়ই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, একবার তার মনোযোগে কিছু বসে গেলে তা সম্পন্ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়।”
বাড়ির টেবিলে রাখা পারিবারিক ফটোগ্রাফের মধ্যে একটি ছবি বিশেষভাবে চোখে পড়ে। ছবিতে এক সোনালি চুলের ছোট ছেলে গাছের শাখা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, আর তার বড় ভাই তাকে সমর্থন করছে। ছবির পেছনে দৃঢ়সংকল্পের ছাপ স্পষ্ট, যা তার ভবিষ্যৎ অভিযানের প্রতিফলন।
স্থানীয় মানুষদের জন্য এই প্রত্যাবর্তন কেবল একটি ব্যক্তিগত গল্প নয়, বরং হালের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বহু বছর ধরে শহরের মানুষ তার যাত্রা অনুসরণ করে আসছে এবং এখন তার বাড়িতে ফিরে আসা তাদের জন্য গর্বের বিষয়। অ্যাঞ্জেলা বুশবিরের ঘরে অপেক্ষা করা এই গর্বের মুহূর্তকে আরও বিশেষ করে তুলবে।
কার্লের প্রত্যাবর্তন হালের স্থানীয় সংস্কৃতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে। তার দীর্ঘ যাত্রা এবং মা-সন্তানের এই আবেগপূর্ণ পুনর্মিলন শহরের তরুণদের মধ্যে স্বপ্ন অনুসরণের প্রেরণা জোগাবে। হালের বন্দর এবং সাটন পার্কের আশেপাশের এলাকায় এই ঘটনার মাধ্যমে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হবে।



