দ্বিতীয়ার্ধের শেষের দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি তীব্রতর হচ্ছে; দুইটি বড় জোটের গঠন প্রকাশিত হয়েছে। একদিকে, বিএনপি নেতৃত্বে ১২টি মিত্রদল সরাসরি আসন‑সমঝোতা করে ভোটের মাঠে নামছে, অন্যদিকে, জামায়াতের নেতৃত্বে ১০টি দলের জোট গঠিত হয়েছে, যার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। উভয় জোটের ঘোষণার অনুষ্ঠান গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়।
বিএনপি‑মুখী জোটে মোট ২৯টি রাজনৈতিক দল অন্তর্ভুক্ত, যদিও সরাসরি কোনো জোটের নাম না থাকলেও ১২টি মিত্রদল আসন‑বণ্টনের মাধ্যমে একসাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এই মিত্রদলগুলোর মধ্যে কিছু দল এখনও সমঝোতা না করলেও, তারা একই গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে ভোটে সমর্থন জানাবে। ফলে, বিএনপি‑মিত্রবৃন্দের সংখ্যা ও প্রভাব নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য হবে।
জামায়াত‑মুখী জোটে মোট দশটি দল একত্রিত হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে জামায়াতের সঙ্গে যুগপত্ আন্দোলনে যুক্ত আটটি দল এই জোটের মূল অংশ গঠন করে। অতিরিক্তভাবে, জুলাই ২০২৩-এ উন্মোচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ পরিচালিত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি সাম্প্রতিক সময়ে এই জোটে যোগদান করেছে। এই সম্প্রসারণের ফলে জামায়াতের জোটের কাঠামো আরও বিস্তৃত ও বহুমুখী হয়েছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান জোটের লক্ষ্যকে “দেশ গঠনের জোট” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই জোটের উদ্দেশ্য কেবল নির্বাচনী জয় নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক সব স্তরে সমন্বিত কাজ করা। সমঝোতা ও জোটের শব্দ ব্যবহার করে তিনি জোটের বহুমুখী দায়িত্বকে তুলে ধরেন, যা দেশের উন্নয়ন ও সংস্কারের বিভিন্ন দিককে অন্তর্ভুক্ত করবে।
ভবিষ্যতে এই দলগুলো একসঙ্গে আন্দোলন চালাবে কিনা, তা নিয়ে জামায়াতের আমির আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রত্যেক দলের নিজস্ব কর্মসূচি থাকবে, তবে জাতীয় বিষয়গুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী একত্রে কাজ করা হবে। এই সমন্বয়কে তিনি “ইনশা আল্লাহ” শব্দে সমাপ্ত করেন, যা জোটের দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে, এনসিপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর দলটির অভ্যন্তরে কিছু বিরোধ দেখা দিয়েছে। দলটির কয়েকজন মনোনীত প্রার্থী ইতিমধ্যে পদত্যাগ করে স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এছাড়া, কিছু সদস্য দলীয় প্রধানকে চিঠি লিখে তাদের আপত্তি জানিয়েছেন, যা জোটের অভ্যন্তরে মতবিরোধের সূচক।
গৃহবিবাদী অবস্থান থেকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় দলের অস্থায়ী সদর দফতরে একটি সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন। তিনি জোটের গঠনকে সংস্কার ও বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে বলা হয়, এবং এই জোটের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন দিকনির্দেশনা আনতে চাওয়া হচ্ছে। তার বক্তব্যে জোটের লক্ষ্যকে দেশের উন্নয়ন ও সমন্বিত নীতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই দুই জোটের গঠন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুনভাবে সাজিয়ে দেবে। বিএনপি‑মিত্রবৃন্দের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও জামায়াত‑মুখী জোটের বহুমুখী গঠন উভয়ই ভোটারদের কাছে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উভয় জোটের সমঝোতা ও কৌশলগত পরিকল্পনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গতিপথ নির্ধারণে মূল উপাদান হবে।
প্রতিটি জোটের মধ্যে থাকা দলগুলোর স্বতন্ত্র স্বার্থ ও নীতি সমন্বয় করার প্রক্রিয়া নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে কীভাবে কাজ করবে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজরে থাকবে। জোটের গঠন ও তাদের ঘোষণার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গঠনে প্রভাব ফেলবে।



