বাংলাদেশে গৃহভাড়া ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে; ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে (জুলাই‑সেপ্টেম্বর) বাড়ির ভাড়া সূচক ৫.১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধি পূর্বের দুই ত্রৈমাসিকের তুলনায় সামান্য বেশি, যেখানে এপ্রিল‑জুনে সূচক ৫.১৬ শতাংশ এবং জানুয়ারি‑মার্চে ৫.১৪ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছিল।
বিএসএস (বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিক্স) সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, এই সূচকটি দেশের সব ধরণের বাসস্থানের ভাড়া পরিবর্তনকে মাপছে, যার মধ্যে পাকা, আধা‑পাকা এবং মাটির বাড়ি অন্তর্ভুক্ত। তথ্য সংগ্রহের পরিধি শহর ও গ্রাম উভয়ই অন্তর্ভুক্ত, ফলে দেশের সমগ্র গৃহবাজারের অবস্থা প্রতিফলিত হয়।
বছরের তুলনায় (YoY) ভাড়া বৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে; ২০২৪ সালের জুলাই‑সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে সূচক ৫.৯১ শতাংশ ছিল। যদিও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাড়তি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তবু পূর্বের বছরের তুলনায় গতি ধীর হয়েছে।
গৃহভাড়া দেশের ভোক্তা মূল্যসূচকের (CPI) অখাদ্য অংশে অন্তর্ভুক্ত, ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গৃহখরচের বোঝা বাড়ছে। নভেম্বর মাসে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছায়, যার মধ্যে অখাদ্য মূল্যের বৃদ্ধি ৯.০৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায় যে গৃহভাড়া এবং অন্যান্য অখাদ্য পণ্যের দাম একসাথে বাড়ছে।
মুদ্রাস্ফীতি প্রায় তিন বছর ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে; মে ২০২৫ পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যসূচক ৯ শতাংশের উপরে ছিল এবং এরপর থেকে ৮ শতাংশের উপরে স্থিতিশীল রয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি গৃহভাড়া বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিএসএসের একজন কর্মকর্তার মতে, ঐতিহ্যগতভাবে গৃহভাড়া বছরের শুরু বা মাঝামাঝি সময়ে বেশি বাড়ে, তবে বর্তমানে এই মৌসুমী ধারা বদলে গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়িয়ে দেন, যা পরবর্তী ভাড়াটিয়ার ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাপ সৃষ্টি করে।
ঢাকায় গৃহভাড়ার চাহিদা ও সরবরাহের পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে কিছু বাড়িওয়ালা অতিরিক্ত ভাড়া বাড়াচ্ছেন, যা ভোক্তা সংস্থার প্রতিনিধিরা উদ্বেগের প্রকাশ করেছেন। ভোক্তা সংস্থার উপ-সভাপতি এস.এম. নাজার হোসেনের মন্তব্যে দেখা যায়, প্রিমাইজ রেন্ট কন্ট্রোল অ্যাক্ট যদিও বহু বছর আগে প্রণয়ন করা হয়েছিল, তবু তা কার্যকর হয়নি।
এই আইনটি গৃহভাড়া নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে, ফলে বাড়িওয়ালারা স্বেচ্ছায় ভাড়া বাড়াতে সক্ষম হচ্ছেন। হোসেনের মতে, এই অবস্থা বিশেষ করে ধনী ও দরিদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে গৃহসুবিধার বৈষম্য বাড়িয়ে তুলছে।
গৃহভাড়া বৃদ্ধির ফলে ভোক্তা ব্যয়ের গঠনেও পরিবর্তন আসছে; গৃহখরচের অংশ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারগুলো অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে স্থির আয়ভিত্তিক গৃহস্থালির জন্য এই পরিস্থিতি আর্থিক সংকটের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যদি গৃহভাড়া বৃদ্ধির গতি অব্যাহত থাকে, তবে ভোক্তা মূল্যসূচকের অখাদ্য অংশে আরও চাপ পড়বে। একই সঙ্গে, বাড়িওয়ালাদের জন্য ভাড়া বাড়ানোর প্রণোদনা বাড়বে, যা বাজারে সরবরাহের ঘাটতি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে, নীতিনির্ধারকদের গৃহভাড়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রিমাইজ রেন্ট কন্ট্রোল অ্যাক্টের যথাযথ বাস্তবায়ন, ভাড়া বাড়ানোর সীমা নির্ধারণ এবং গৃহসুবিধা বাড়ানোর জন্য সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে গৃহবাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, গৃহভাড়া ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা দেশের মুদ্রাস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। নীতি সংশোধন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গৃহবাজারের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



