বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর শ্রেণীবদ্ধ ঋণ FY২৫ অর্থবছরে ৪২৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা পূর্ববছরের ১৯৯ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিমাণের অধিকাংশই বাংলাদেশ জুটিমিলস কর্পোরেশন (BJMC) বহন করেছে; এর ঋণ ৩৭৭ কোটি টাকায় বৃদ্ধি পেয়ে মোটের ৮৭.৮৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
BJMC ২০২০ সালে সরকারীভাবে ২৫টি জুটি মিল বন্ধ করার পরেও আর্থিক ঘাটতি থেকে মুক্তি পায়নি। ক্ষতি, উচ্চ উৎপাদন খরচ ও অদক্ষতা উল্লেখ করে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, অবশিষ্ট মিলগুলো ধারাবাহিকভাবে ক্ষতির শিকারে রয়ে গেছে।
২০২১ সালের এপ্রিল মাসে BJMC সরকারী জুটি কারখানার ১৭টি মিলকে ৫ থেকে ২০ বছরের লিজে দিতে উদ্যোগ নেয়, যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে আর্থিক চাপ কমানো যায়। এরপর থেকে একাধিক মিল বেসরকারি অপারেটরের হাতে হস্তান্তর করা হলেও, বাকি কার্যকরী মিলগুলো এখনও ক্ষতির মুখে, ফলে ঋণ শ্রেণীবিভাগে চাপ বাড়ছে।
অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (BADC) দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে; এর শ্রেণীবদ্ধ ঋণ FY২৫-এ ২১ কোটি টাকায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। তবে BADC মোট বকেয়া ঋণ ১৮,০৫৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা পূর্ববছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি সর্বোচ্চ ঋণগ্রহীতা হিসেবে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) FY২৫-এ দ্বিতীয় বৃহত্তম ঋণধারী হিসেবে উঠে এসেছে; এর বকেয়া ঋণ ৯,৫৭৯ কোটি টাকায় বেড়েছে, যেখানে এক বছর আগে মাত্র ১৭৫ কোটি টাকাই ছিল। পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি, বিতরণ ও বিক্রয় দায়িত্বে থাকা BPC-এর এই তীব্র ঋণবৃদ্ধি বাজারে তেল-গ্যাস সেক্টরের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (TCB) ও উল্লেখযোগ্য ঋণবৃদ্ধি দেখিয়েছে; এর বকেয়া ঋণ ৭,৩৩৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা পূর্ববছরের তুলনায় ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। TCB দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই এর ঋণ চাপ সরাসরি বাণিজ্যিক প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মোট বকেয়া ঋণ FY২৫ শেষে ৬৩,৩৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারাবাহিক ঋণবৃদ্ধি সরকারী আর্থিক ভারসাম্যের ওপর চাপ বাড়িয়ে তুলেছে এবং ভবিষ্যৎ বাজেটের গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ঋণবৃদ্ধি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ক্রেডিট রেটিং হ্রাস পেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহে কঠিনতা বাড়াবে। বিশেষ করে BJMC-এর ধারাবাহিক ক্ষতি ও উচ্চ ঋণ স্তর সরকারকে পুনর্গঠন বা সম্পদ বিক্রয়ের দিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
BJMC-র লিজে দেওয়া মিলগুলো থেকে বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি পেলে কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পাওয়া সম্ভব, তবে অবশিষ্ট মিলের কার্যকরী দক্ষতা ও উৎপাদন খরচ হ্রাস না করা পর্যন্ত ঋণ চাপ কমবে না। তাই সরকারকে উৎপাদন প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, শক্তি দক্ষতা ও বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণে পদক্ষেপ নিতে হবে।
BADC-র ক্ষেত্রে, ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ কৃষি ইনপুটের সরবরাহে মূল্যবৃদ্ধি ও সাপ্লাই চেইনের অদক্ষতা। কৃষি সেক্টরের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ঋণ পুনর্গঠন, সস্তা ক্রেডিট সুবিধা ও প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা করা জরুরি।
BPC-র ঋণবৃদ্ধি তেল-গ্যাসের আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামা ও দেশীয় জ্বালানি নীতির পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। সরকারকে জ্বালানি মিশ্রণ নীতি, পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ও তেল-গ্যাসের দক্ষ আমদানি কৌশল গড়ে তুলতে হবে, যাতে ঋণ চাপ কমে।
TCB-র ঋণবৃদ্ধি রপ্তানি-আমদানি ভারসাম্যের পরিবর্তন ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাণিজ্যিক লেনদেনের স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, পাশাপাশি ঋণ পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ করলে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ঋণবৃদ্ধি দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। ঋণ চাপ কমাতে কাঠামোগত সংস্কার, বেসরকারি অংশীদারিত্বের সম্প্রসারণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। না হলে ঋণ সঙ্কটের ঝুঁকি বাড়বে এবং সরকারী ব্যয় পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে।



