রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর রাত প্রায় ১১ টায় কক্সবাজারের টেকনাফে অবস্থিত ২৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। আগুনের শিখা দ্রুত ছড়িয়ে প্রায় ৪০টি বসতি-ঘর পুড়িয়ে দেয়। স্থানীয় ক্যাম্প প্রতিনিধিরা জানান, অগ্নি নিয়ন্ত্রণে আনুমানিক আধা ঘণ্টা সময় লেগেছে।
অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা দ্রুত কাজ করে। ফায়ার সার্ভিসের দল, ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবী রোহিঙ্গা ও পুলিশ সদস্যরা সমন্বিতভাবে আগুন নেভাতে কাজ করেন।
ক্যাম্পের মাঝি আমিনুল ইসলাম (নাম প্রকাশ না করে) নিশ্চিত করেন যে, আগুনের ফলে প্রায় চল্লিশটি বসতি-ঘর সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সঠিক সংখ্যা এখনও যাচাই করা হচ্ছে। অগ্নি নিয়ন্ত্রণের পরেও ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করা এবং শরণার্থীদের অস্থায়ী আশ্রয় প্রদান করা অবশিষ্ট কাজ হিসেবে রয়ে গেছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও মো. ইনামুল হাফিজ নাদিম জানান, আগুনের সূত্রপাতের পদ্ধতি এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত শুরু করেছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশে শরণার্থী সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগণ এখানে অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করে, যেখানে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবিক সংস্থা সহায়তা প্রদান করে। এই ক্যাম্পগুলোতে ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ, সীমিত অবকাঠামো এবং অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব প্রায়ই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলো আন্তর্জাতিক দাতাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে, কারণ শিবিরে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, টেকনাফের মতো সীমান্তবর্তী শিবিরে অগ্নিকাণ্ড মানবিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, বিশেষ করে যখন মৌসুমী বৃষ্টিপাত ও বিদ্যুৎ ঘাটতি সহায়তা কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, দ্রুত পুনর্নির্মাণ ও অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা শরণার্থীদের মৌলিক চাহিদা পূরণে অপরিহার্য।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে জরুরি ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ত্রাণে অস্থায়ী শেল্টার, পরিষ্কার পানীয় জল এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া, ক্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন ও অগ্নি প্রতিরোধক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক দাতাদের সমর্থন চাওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই ঘটনার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে, শরণার্থী ক্যাম্পে নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। মন্ত্রণালয় জোর দেয় যে, শরণার্থীদের নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ প্রদান করা দেশের অগ্রাধিকার।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে সম্ভাব্য কারণগুলোতে বৈদ্যুতিক ত্রুটি, গ্যাস সিলিন্ডারের লিক বা মানবিক ত্রুটি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী ভবিষ্যতে ক্যাম্পে অগ্নি নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে।
এই অগ্নিকাণ্ডের পর শিবিরে পুনর্নির্মাণ কাজ দ্রুততর করার জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। শরণার্থীদের পুনরায় বাসস্থানে ফিরিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা প্রদান এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধে কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।



