ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা-এ পাকিস্তানের হাই কমিশনার ইমরান হায়দার ও প্রধানমন্ত্রী প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুজনেই গত আর্থিক বছরে দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ও নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
হায়দার জানান, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (এসবিপি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ‑পাকিস্তান বাণিজ্য প্রায় ২০ % বৃদ্ধি পেয়ে ৮৬.৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। পূর্ববর্তী বছর ৭১.১৭ কোটি ডলারের তুলনায় এই অঙ্কে স্পষ্ট উন্নতি দেখা গেছে।
বাণিজ্যের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তান মূলত বাংলাদেশ থেকে কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য আমদানি করে। এতে গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচা উপকরণ, চামড়া, ক্লিংকার, ফ্যাব্রিক্স, তুলা, পাশাপাশি পেঁয়াজ ও আলু অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে চা, তৈরি পোশাক এবং কাঁচা পাটের মতো পণ্য বেশি করে আনে।
বাণিজ্যিক উন্নয়নের পাশাপাশি দু’দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক বিনিময়ও ত্বরান্বিত হচ্ছে। হায়দার উল্লেখ করেন, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে চিকিৎসা, ন্যানোপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে দু’দেশের গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে পারে।
চিকিৎসা পর্যটনের ক্ষেত্রেও উভয় পক্ষের চাহিদা বাড়ছে। লিভার ও কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাকিস্তান এই সেবার প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক সুযোগ প্রদান করতে প্রস্তুত। এটি স্বাস্থ্যসেবা সেক্টরে নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাণিজ্যিক সংযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরাসরি বিমান সেবার সূচনা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হায়দার জানিয়েছেন, আগামী জানুয়ারি ঢাকা‑করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হবে, যা ব্যবসায়িক ভ্রমণ ও পণ্য পরিবহনের সময়সীমা কমিয়ে বাজারের তরলতা বাড়াবে।
বৈঠকে এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য) সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদও উপস্থিত ছিলেন, যা দু’দেশের সহযোগিতায় টেকসই উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। উভয় পক্ষই পরিবেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যৌথ প্রকল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
মুখ্য উপদেষ্টা ইউনূস দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান মানুষ‑থেকে‑মানুষ সংযোগকে স্বাগত জানিয়ে, সফর, সাংস্কৃতিক ইভেন্ট ও একাডেমিক বিনিময়ের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের আন্তঃক্রিয়া বাণিজ্যের ভিত্তি শক্তিশালী করে এবং দীর্ঘমেয়াদী পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করে।
হায়দার ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগ ক্ষেত্র ও যৌথ উদ্যোগের সন্ধান বাড়াতে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি উল্লেখ করেন, তার মেয়াদে উভয় দেশ নতুন শিল্প, প্রযুক্তি ও সেবা সেক্টরে সহযোগিতা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নতুন দিক উন্মোচন করবে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাণিজ্যের পরিমাণে ২০ % বৃদ্ধি যদিও ইতিবাচক, তবে উভয় দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য এখনও অসম। পাকিস্তান থেকে চা ও পোশাকের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে বেশি, যেখানে বাংলাদেশি রপ্তানি মূলত কাঁচামাল। এই বৈষম্য সমন্বয় করতে দু’দেশের নীতি নির্ধারকদের কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, এই বৈঠক দু’দেশের বাণিজ্যিক, শিক্ষামূলক ও স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রের সহযোগিতা বাড়ানোর একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা যায়। সরাসরি ফ্লাইট, শিক্ষার্থী প্রবাহ ও চিকিৎসা পর্যটনের বৃদ্ধি ভবিষ্যতে বাণিজ্যের পরিমাণ ও গুণগত মান উভয়ই উন্নত করতে পারে। তবে বাণিজ্যিক ভারসাম্য, লজিস্টিক খরচ ও নিয়ন্ত্রক বাধা মোকাবিলায় সতর্ক নীতি গ্রহণ অপরিহার্য।



