বঙ্গের প্রাচীন সামাজিক কাঠামোর মধ্যে, বিশ শতকের শুরুর দিকে এক মুসলিম নারী সমাজের পুনর্গঠন নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কল্পনা কেবল ক্ষমতার উল্টে দেওয়া নয়, বরং ক্ষমতা, জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে নতুন নীতির ভিত্তিতে সাজানোর আহ্বান জানায়।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত তার “সুলতানার স্বপ্ন” উপন্যাসটি প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃত, তবে এর মূল বার্তা হল ন্যায়সঙ্গত সমাজ গড়তে ক্ষমতার কাঠামো ও প্রযুক্তির ব্যবহার পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। কল্পনাকে পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে তিনি শক্তি, শ্রম, শাসন ও স্বাধীনতার সমস্যাগুলোকে সমাধানের পথ দেখিয়েছেন, যা আজকের সময়েও প্রাসঙ্গিক।
উপন্যাসের লেডিল্যান্ডের সমাজ কাঠামো দুইটি মূল স্তম্ভে ভিত্তিক: নৈতিক শাসনব্যবস্থা এবং মুক্ত অর্থনীতি। শিল্পধোঁয়া ও ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে এই ধারণা প্রকাশ করা রোকেয়ার দৃষ্টিভঙ্গি চমকপ্রদ। তিনি নারী বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে “সৌর শক্তি” ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করে তোলেন, যা তার ভবিষ্যদ্বাণীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এই প্রযুক্তিগত পছন্দের মাধ্যমে তিনি শক্তির ব্যবহারকে নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করেন। জীবাশ্ম জ্বালানির ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে তিনি পুরুষদের যুদ্ধময় স্বভাবের সঙ্গে তুলনা করে দেখিয়েছেন, ফলে প্রযুক্তি যদি নৈতিক মানদণ্ডে ভিত্তিক না হয়, তবে তা সমাজকে ক্ষতি করবে।
সৌরশক্তি ও নৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়ে তিনি স্বচ্ছ, সবুজ শহরের মডেল উপস্থাপন করেন। কংক্রিটের বদলে ফুলে ভরা পথ, ধোঁয়া না থাকা বাতাস—এগুলো কল্পিত হলেও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। রোকেয়া দেখিয়েছেন যে নৈতিক শাসন ও পরিষ্কার শক্তি একসাথে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
উপন্যাসে বর্ণিত লেডিল্যান্ডের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা স্বতন্ত্র ও মুক্ত, যেখানে শ্রমিকদের কাজের সময় সীমিত এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়। তিনি দুই ঘণ্টার কাজের দিনকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের রক্ষায় সহায়ক। এই ধারণা আধুনিক কাজের সংস্কৃতিতে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
রোকেয়ার কল্পনা কেবল স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তবিক সমাধানের সন্ধান। তিনি দেখিয়েছেন যে প্রযুক্তি যদি মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে তা সমাজের সমতা ও সমৃদ্ধি বাড়াতে পারে। তার সময়ের শিল্পায়নের বিপরীতে তিনি পরিবেশবান্ধব বিকল্পের পক্ষে সওয়াল করেন।
আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় এই ধারণাগুলোকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যদি রোকেয়ার উদাহরণ থেকে শিখে, তবে তারা প্রযুক্তি ও নৈতিকতার সংযোগ বুঝতে পারবে এবং ভবিষ্যতে টেকসই সমাধান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
বিশ্বব্যাপী কর্মদিবসের সময়সীমা নিয়ে চলমান আলোচনায় রোকেয়ার দুই ঘণ্টার কাজের দিন মডেল একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে। সংক্ষিপ্ত কাজের সময় কর্মীর উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং জীবনের মান উন্নত করে, যা আধুনিক গবেষণায়ও সমর্থিত।
শিক্ষা ক্ষেত্রের নীতি নির্ধারকরা যদি রোকেয়ার নৈতিক ও পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন, তবে স্কুল ও কলেজে সবুজ প্রযুক্তি ও ন্যায়সঙ্গত শাসনের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে। এভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশ সচেতন ও নৈতিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে গড়ে তোলা যাবে।
রোকেয়ার কাজের মূল বার্তা হল: কল্পনা ও নৈতিকতা একসাথে মিলিয়ে সমাজের কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব। তার উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী বাস্তব নীতির পরীক্ষার মঞ্চ হতে পারে, যা শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সঞ্চারিত হলে সমাজের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
আপনার কি মনে হয়, দুই ঘণ্টার কাজের দিন বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, এবং কীভাবে শিক্ষার মাধ্যমে এই ধারণাকে তরুণদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়? এই প্রশ্নের উত্তর আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভাবুন।



