রোববার বিকাল চারটায় মিয়ানমারের জান্তা সরকার পরিচালিত জাতীয় নির্বাচনের প্রথম দফা শেষ হয়েছে। ভোটদান ২৮ ডিসেম্বর থেকে এক মাসব্যাপী চলার পর নির্ধারিত সময়ে সমাপ্তি পায়। এই পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় এবং ফলাফল সংকলনের কাজ চলমান।
প্রথম পর্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ও সামরিক নেতৃত্বের মুখে ভোটের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিয়ে দাবি উঠে। জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রকাশ্যে বলেন, নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই নির্বাচন পরিচালিত হওয়ায় কোনো অনিয়মের সম্ভাবনা নেই।
মিন অং হ্লাইংের এই মন্তব্যের পর তিনি সরাসরি ক্যামেরার সামনে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন: “আমরা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এটি সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমরা আমাদের নাম কলঙ্কিত হতে দিতে পারি না।” এই উক্তি সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনের বৈধতা ও ন্যায়পরায়ণতা জোরদার করে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থা এই নির্বাচনের স্বভাব নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করে। কিছু পর্যবেক্ষক এটিকে সামরিক শাসনকে পুনঃনামকরণের একটি কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে সামরিক শাসনের বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা উল্লেখ করেন, ভোটের ফলাফলকে ব্যবহার করে সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হতে পারে।
মিয়ানমার ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে ব্যাপক অস্থিরতা ও সহিংসতার মধ্যে রয়েছে। ঐ অভ্যুত্থানে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারকে উখাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। এরপর থেকে দেশটি গৃহযুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক দমনমূলক নীতির মুখে পড়ে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, চলমান গৃহযুদ্ধের পাশাপাশি ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ মিয়ানমারের মানবিক পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। বিশেষ করে মার্চ মাসে সংঘটিত তীব্র ভূমিকম্পের ফলে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং মৌলিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এই সব কষ্টের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নের জন্ম দেয়।
প্রথম পর্যায়ের ভোটগ্রহণের পরবর্তী ধাপ হিসেবে সরকার জান্তা নির্বাচনের বাকি দুই দফা পরিকল্পনা করেছে, যা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই পরবর্তী পর্যায়ে ভোটার তালিকা সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং ফলাফল প্রকাশের প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হবে।
অবশেষে, মিয়ানমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কীভাবে গড়ে উঠবে তা এখনও অনিশ্চিত। যদি নির্বাচনের ফলাফল সামরিক শাসনের বৈধতা বাড়িয়ে দেয়, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ কমে যেতে পারে এবং দেশীয় বিরোধী গোষ্ঠীর অবস্থান দুর্বল হতে পারে। অন্যদিকে, যদি নির্বাচনকে অবৈধ বা জাল বলে গণ্য করা হয়, তবে দেশের অভ্যন্তরে আরও অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, তা পরবর্তী পর্যায়ের ফলাফলের উপর নির্ভরশীল।



