ফরাসি চলচ্চিত্রের প্রাক্তন তারকা ও প্রাণী অধিকার কর্মী ব্রিগিট বার্ডো ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার মৃত্যুর খবর তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠিত ব্রিগিট বার্ডো ফাউন্ডেশন রবিবার প্রকাশ করে, যেখানে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময় ও স্থান উল্লেখ করা হয়নি।
ফাউন্ডেশন এফপি সংস্থাকে পাঠানো বিবৃতিতে বার্ডোকে “বিশ্বব্যাপী পরিচিত অভিনেত্রী ও গায়িকা” বলা হয়েছে, যিনি তার উজ্জ্বল ক্যারিয়ার ত্যাগ করে প্রাণী কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করেছেন। প্রতিষ্ঠানের মতে, তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় প্রাণী সুরক্ষার জন্য কাজ করেছেন।
বার্ডো ১৯৩৪ সালে প্যারিসে একটি রক্ষণশীল ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্যারিস কনসারভেটরিতে ব্যালে প্রশিক্ষণ নেন এবং কিশোর বয়সে মডেলিং শুরু করেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি ফরাসি ফ্যাশন ম্যাগাজিন এল-এ কভার মডেল হিসেবে প্রকাশিত হন, যা তাকে চলচ্চিত্র জগতের দরজা খুলে দেয়।
১৯৫৬ সালে “এন্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান” ছবিতে তার অভিনয় তাকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত করে। এই চলচ্চিত্রে নারী যৌনতার প্রকাশের মাধ্যমে তিনি নতুন এক ধারা শুরু করেন, যা পরবর্তী বছরগুলোতে তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়।
সেই সময়ের পর থেকে তিনি প্রায় পঞ্চাশটি চলচ্চিত্রে কাজ করেন এবং যুদ্ধোত্তর ফরাসি সিনেমার অন্যতম মুখ হিসেবে স্বীকৃত হন। তার চিত্রময় উপস্থিতি এবং স্বতন্ত্র স্টাইল ফরাসি চলচ্চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে আলোকিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে, সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে তিনি অভিনয় ত্যাগ করেন এবং প্রাণী সুরক্ষার দিকে মনোনিবেশ করেন। তার এই পরিবর্তনটি তখনকার ভক্তদের মধ্যে বিস্ময় ও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
প্রাণী অধিকার কর্মে তিনি নিজের ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বন্যপ্রাণী ও গৃহপালিত প্রাণীর কল্যাণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প চালু করা হয়। এই কাজের জন্য তিনি সমর্থকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছেন, যদিও তার রাজনৈতিক মতামত পরবর্তীতে বিতর্কের জন্ম দেয়।
১৯৮০-এর দশক থেকে তিনি ফরাসি রাষ্ট্রীয়-ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট (বর্তমানে ন্যাশনাল র্যালি) এবং তার দীর্ঘমেয়াদী নেতা মারিন লেপেনের প্রতি উন্মুক্ত সমর্থন প্রকাশ করেন। তার এই সমর্থন তাকে সাংস্কৃতিক আইকন থেকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
বহুবার ফরাসি আদালত তাকে জাতিগত ঘৃণার উস্কানিমূলক মন্তব্যের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে। তার প্রকাশিত বক্তব্যগুলোতে অ-ফরাসি উত্সের মানুষকে লক্ষ্য করে অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা আইনি শাস্তির কারণ হয়েছে।
২০২২ সালে, তিনি রিইউনিয়ন দ্বীপের বাসিন্দাদের “অবিকৃত জিন” এবং “অবিকৃত মানুষ” বলে বর্ণনা করার জন্য ৪০,০০০ ইউরো (প্রায় ৪৭,০০০ ডলার) জরিমানা করা হয়। এটি তার ষষ্ঠবারের মতো রেসিস্ট্যান্স-সম্পর্কিত শাস্তি, যা তার রেকর্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তার বিতর্কিত মন্তব্যের লক্ষ্য প্রায়ই মুসলিম সম্প্রদায় এবং অভিবাসী গোষ্ঠী ছিল। এই গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তার অবমাননাকর রেটরিক্স সামাজিক সংহতি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আলোচনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে, তিনি ১৯৫০-এর দশকে ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক রজার ভাদিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যদিও এই বিবাহের পরেও তার পেশাগত ও সামাজিক পথ আলাদা হয়ে যায়।
বার্ডোর জীবন ও কাজের মিশ্রণ আজও বিতর্কের বিষয়। একদিকে তিনি ফরাসি চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগের প্রতীক এবং প্রাণী সুরক্ষার সমর্থক হিসেবে স্মরণীয়, অন্যদিকে তার রাষ্ট্রীয়-ডানপন্থী ও বর্ণবাদী মন্তব্য তাকে সমালোচনার মুখে রেখেছে।
মৃত্যুর পরেও তার উত্তরাধিকার চলচ্চিত্র, প্রাণী অধিকার এবং রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্রগুলোতে প্রভাব ফেলতে থাকবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তার জটিল চরিত্রের দিকে নজর দিতে বাধ্য করবে।



