ময়মনসিংহের গৌরীপুরে জুলাই‑আগস্ট ২০২৪-এ সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনজনের মৃত্যু ঘটার মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের শেষ তারিখ পুনরায় নির্ধারণ করেছে। রোববার রাষ্ট্রপক্ষের (প্রসিকিউশন) অনুরোধে ট্রাইব্যুনাল ২৮ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরের দিনকে নতুন সময়সীমা হিসেবে স্থাপন করেছে।
আদালতের দুই সদস্যের প্যানেল, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর, রোববারের শুনানিতে প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারকে সময় বাড়ানোর আবেদন গ্রহণ করেন। তিনি তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি জানিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে অতিরিক্ত এক মাসের অনুরোধ করেন। প্যানেল শেষে আবেদন মঞ্জুর করে ২৮ জানুয়ারি নতুন দাখিলের তারিখ নির্ধারণ করে।
প্রসিকিউশনের অনুরোধের পরই, একই দিনে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে কারাগার থেকে ছয়জন সন্দেহভাজনকে ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করা হয়। তারা আদালতের কার্যক্রম চলাকালে কাঠগড়ায় (ডক) উপস্থিত ছিলেন। এই ছয়জনের মধ্যে গৌরীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আহমেদের পুত্র তানজির আহমেদ রাজিব, গৌরীপুর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক শফিকুল আলম, সহকারী উপপরিদর্শক দেলোয়ার হোসাইন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাহাবুল আলম, জোসেফ উদ্দিন জজ এবং আতাউর রহমান ফকির (ফারুক আহমেদ) অন্তর্ভুক্ত।
মামলার মূল ঘটনা জুলাই‑আগস্ট ২০২৪-এ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্তৃত প্রতিবাদ আন্দোলনের সময় গৌরীপুরে ঘটেছিল। ৫ আগস্ট গৌরীপুর থানা সমীপে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সশস্ত্রভাবে প্রতিবাদকারীদের ওপর আক্রমণ চালায়। এই হিংসাত্মক আক্রমণে বিপ্লব হাসান, মো. নূরে আলম সিদ্দিকী এবং মো. জুবায়ের প্রাণ হারায়; পাশাপাশি বহু ছাত্র ও সাধারণ মানুষ আহত হয়।
আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়। তদন্ত সংস্থা ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী বিবৃতি এবং সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করছিল, তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত রূপ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রসিকিউশন সময় বাড়ানোর আবেদন করে।
ট্রাইব্যুনালের প্যানেল, মামলার তদন্তের অগ্রগতি ও প্রমাণের পরিমাণ বিবেচনা করে, এক মাসের অতিরিক্ত সময় প্রদান করে। এই সময়সীমা বাড়িয়ে ২৮ জানুয়ারি নতুন দাখিলের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে তদন্ত সংস্থা সকল প্রাসঙ্গিক তথ্য সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পারে।
আদালতে উপস্থিত ছয়জন আসামিরা কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে ট্রাইব্যুনালের হিয়ারিং রুমে প্রবেশ করেন। তাদের উপস্থিতি মামলার প্রক্রিয়াগত দিকগুলোকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বিচারের জন্য প্রমাণের যথার্থতা যাচাইয়ের সুযোগ প্রদান করবে।
এই মামলায় উল্লেখযোগ্য যে, গৌরীপুরে ঘটিত হিংসা শুধুমাত্র তিনজনের মৃত্যু নয়, বরং বহু মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিও সৃষ্টি করেছে। ঘটনাস্থলে গৃহীত সশস্ত্র আক্রমণকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং তাই আন্তর্জাতিক আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়িত্ব আরোপের ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রসিকিউশন ও ট্রাইব্যুনালের মধ্যে সময় বাড়ানোর আলোচনায় উভয় পক্ষই তদন্তের স্বচ্ছতা ও পূর্ণাঙ্গতা নিশ্চিত করার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। অতিরিক্ত সময়ের মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহের গতি বাড়িয়ে, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাক্ষ্য ও নথিপত্র যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মামলার বর্তমান অবস্থা অনুসারে, তদন্ত সংস্থা এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করার পথে রয়েছে। নতুন সময়সীমা ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত হওয়ায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হবে সমস্ত প্রাসঙ্গিক তথ্য একত্রিত করে ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করা।
এই প্রক্রিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোরতা বজায় রাখা হয়েছে, যাতে আদালতে উপস্থিত আসামিরা ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন না হন। আদালত ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে কড়া নিরাপত্তা পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।
ময়মনসিংহ গৌরীপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ানো, আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই মামলার ফলাফল দেশের মানবাধিকার রক্ষার জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।



