রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রপ্রতিনিধি গোষ্ঠীর অতিরিক্ত কার্যক্রমকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক রোববার একটি বিবৃতি প্রকাশ করে তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানায়। নেটওয়ার্কের সদস্যরা উল্লেখ করেন, নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের কিছু কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষাবিদ্যার স্বার্থের বিরোধী।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য ছাত্র প্রতিনিধিদের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা প্রয়োজন। নেটওয়ার্কের মুখপাত্র উল্লেখ করেন, শিক্ষকেরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারা না হলে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই বিবৃতির পটভূমিতে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাকে নেটওয়ার্কের মতে ছাত্র প্রতিনিধিদের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আম্মার রাকসুর গোষ্ঠী বিভিন্ন ক্যাম্পাসে মবপ্রবণতা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর হুমকি এবং অনধিকারী হস্তক্ষেপের অভিযোগে মুখোমুখি হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, যা সরাসরি আম্মারের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর কার্যক্রমের ফলাফল হিসেবে নেটওয়ার্ক উল্লেখ করে। ডিনদের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর, আম্মার নিজে কল করে তাদের পদত্যাগ নিশ্চিত করেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশ দেন।
নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, রাকসুর গোষ্ঠীর কিছু নেতা ক্যাম্পাসে হুমকি জানিয়ে শিক্ষকদের শারীরিকভাবে বাধা দেয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কিছু নেতা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা শিক্ষকদেরকে ‘কলার ধরে টেনে এনে প্রশাসন ভবনের সামনে বাঁধা’ বলে হুমকি দিয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোস্তাকুর রহমান জাহিদের কথাও নেটওয়ার্কে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি একবার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রকার ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্ট’ শিক্ষক ক্লাসে আসতে পারবে না’। এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভারতীয় হাইকমিশন উচ্ছেদেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা শিক্ষাবিদ্যার স্বায়ত্তশাসনের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে নেটওয়ার্কের দৃষ্টিতে দেখা হয়।
ছাত্র প্রতিনিধিরা কিছু সময়ে প্রধান দৈনিক ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’ এবং দুইটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ ও ‘উদীচী’ বন্ধ করার হুমকি দিয়েছেন। নেটওয়ার্কের মতে, এই ধরনের হুমকি শিক্ষার স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বতন্ত্রতা উভয়েরই ক্ষতি করে।
নেটওয়ার্ক উল্লেখ করে, রাকসুর গোষ্ঠীর কিছু নেতা সরাসরি ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এই সংযোগের ফলে ক্যাম্পাসে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শিক্ষার পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের মতে, এই ধরনের অতিরিক্ত কার্যক্রম শিক্ষাবিদ্যার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আক্রমণ এবং দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘স্পাইরাল ইফেক্ট’ সৃষ্টি করতে পারে। নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিরা সতর্কতা প্রকাশ করেন, যদি এধরনের হুমকি অব্যাহত থাকে তবে শিক্ষার মান ও স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর দ্রুত দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় নেটওয়ার্কের মধ্যে তীব্র বিরক্তি দেখা যায়। নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হাদির গুলিবর্ষণ ও মৃত্যুর পর opportunistic গোষ্ঠী একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে।
হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় সরকারকে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে, এবং একই সঙ্গে ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’ বন্ধের হুমকি দেওয়া গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে। নেটওয়ার্কের শেষ মন্তব্যে শিক্ষকেরা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বতন্ত্র শিক্ষার পরিবেশের জন্য সকল অতিরিক্ত হুমকি ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করার দাবি পুনরায় জোর দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা সংক্রান্ত এই জটিল পরিস্থিতিতে পাঠকদের জন্য একটি ব্যবহারিক প্রশ্ন রেখে দেওয়া যায়: ক্যাম্পাসে স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষক কীভাবে পারস্পরিক সম্মান ও সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ শিক্ষার গুণগত মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



