মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের সীমান্তে কক্সবাজার ও বান্দরবানের তিনটি ইউনিয়ন (উখিয়া, টেকনাফের হোয়াইক্যং ও নাইক্ষ্যংছড়ি) রাতভর গুলিবর্ষণ ও মর্টারশেলের তীব্র শব্দ শোনা যায়। ঘটনাটি শনিবার রাত ১১টা থেকে রবিবার রাত ৩টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, ফলে প্রায় তিন হাজার বাসিন্দা আতঙ্কে রাত কাটাতে বাধ্য হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, উখিয়ার পালংখালী ও রাজাপালং, টেকনাফের হোয়াইক্যং এবং নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের কিছু গ্রামে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। শব্দের তীব্রতা এমন যে, কিছু এলাকায় বাড়ি কাঁপে যাওয়ার অনুভূতি হয়েছে।
মিয়ানমার রক্ষা বাহিনীর (জান্তা) মতে, রাত ১১টার দিকে আরাকান আর্মি (আর্কান আর্মি) হঠাৎ বিমান হামলা চালায় এবং একই সঙ্গে পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। উভয় পক্ষের আক্রমণ ভোর পর্যন্ত চলতে থাকে। এই সময়ে শূন্য লাইন (বর্ডার পিলার) থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে এবং শূন্য লাইন থেকে আনুমানিক ১৩ কিলোমিটার ভেতরে রাখাইন রাজ্যের বলিবাজার এলাকায় বিস্ফোরণের ঝলক দেখা গিয়েছে। বলিবাজারে আরাকান আর্মির সদর দপ্তর অবস্থিত বলে স্থানীয়রা জানায়।
বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী (বর্ডার গার্ড) জানায়, হোয়াইক্যং এলাকায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা গিয়েছে, তবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্যে কোনো গোলা বা বোমা পৌঁছায়নি। উখিয়া ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জসীম উদ্দিনের মতে, শূন্য লাইন ভেতরে কোনো ক্ষতি ঘটেনি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রক্ষা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা রাখাইন অঞ্চলে আরাকান আর্মি ও জান্তার মধ্যে চলমান সংঘর্ষের ফলে সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্থিরতা বাড়ছে। পাঁচ বছর পর মিয়ানমারে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পেট্রোল ও নজরদারি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা গুলো এই ধরনের সীমান্ত সংঘর্ষকে মানবিক উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি বিশেষজ্ঞ রাহুল সেন বলেন, “মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে চলমান গুলিবর্ষণ উভয় দেশের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে, তাই দ্রুত কূটনৈতিক সংলাপের প্রয়োজন।”
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সীমান্তে গুলিবর্ষণ বন্ধের জন্য আলোচনা শুরু করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মতে, উভয় দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বয় বাড়িয়ে শূন্য লাইন ভেতরে কোনো শত্রু কার্যক্রম না ঘটার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলোকে এই অঞ্চলের শান্তি রক্ষায় সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অস্থায়ী শরণার্থী ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং মৌলিক খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বন্যা ও সাইক্লোনের ঝুঁকি বিবেচনা করে, সরকার অতিরিক্ত মানবিক সহায়তা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
এই ঘটনার পর, প্রতিবেশী দেশগুলোও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। থাইল্যান্ড ও চীন উভয়ই মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার পক্ষে মত প্রকাশ করেছে।
সামগ্রিকভাবে, রাখাইন থেকে কক্সবাজার‑বান্দরবানের সীমান্তে রাতভর গুলিবর্ষণ শূন্য লাইন ভেতরে কোনো শারীরিক ক্ষতি না ঘটলেও, স্থানীয় জনগণের জীবনে অস্থিরতা ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে কূটনৈতিক সংলাপ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং মানবিক সহায়তা একসাথে কাজ করা জরুরি।



