২৭ অক্টোবর, ঢাকা‑এর মোহাম্মদপুরে একটি বাসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এক তরুণী অর্ধ‑ভাড়া পরিশোধের পর বাস সহকারী কর্মীর অশালীন মন্তব্যের মুখে জুতা হাতে প্রতিবাদ করেন। প্রতিবাদে তাকে শারীরিক আক্রমণ করা হয় এবং সেই ঘটনার মানসিক আঘাত থেকে এখনও সেরে উঠতে পারছেন না। দুই মাস পর, তিনি জানালেন যে, যেকোনো নারী‑বিরোধী হিংসা দেখলে সেই দিনটির স্মৃতি ফিরে আসে এবং তিনি বিষণ্ন বোধ করেন।
একই সময়ে, অন্য একটি নারী গৃহস্থালি সমস্যার কথা শেয়ার করে কাঁদতে বাধ্য হন। বিবাহের পর থেকে স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি ও তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে দুজনের জীবন অস্থির। সম্প্রতি স্বামী তাকে তালাকের নোটিশ পাঠিয়েছে, যা পরিবারের মধ্যে অতিরিক্ত উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
গৃহহিংসার আরেকটি মারাত্মক উদাহরণ ১৩ আগস্ট শেওড়াপাড়ায় ঘটেছে। ২৫ বছর বয়সী সৈয়দা ফাহমিদা তাহসিন শ্বাসরোধে মারা যান, তার স্বামী সিফাত আলী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পরিবার দাবি করে যে, স্বামীই হত্যাকারী এবং পুলিশ তাকে গ্রেফতার করার জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ ২০ থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত “উইমেন ম্যানিফেস্টো” শিরোনামে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে ঢাকা ও তার বাইরের ২,৫৮০ জন নারী অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই গণপরিবহন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং পারিবারিক পরিবেশে ঘটে যাওয়া হিংসাকে গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বিশেষ করে ৯৪ শতাংশ নারী জানান, এই তিনটি ক্ষেত্রের হিংসা তাদের নিরাপত্তা অনুভূতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশের বেশি এটিকে ‘গুরুতর সমস্যা’ বলে বিবেচনা করেন। জরিপে প্রকাশিত হয়েছে যে, নারীরা কাজের সময় বা অনলাইন যোগাযোগে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন এবং পারিবারিক বাধা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
অধ্যাপক তানিয়া হক, যিনি জরিপের তত্ত্বাবধান করেন, উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক গণ‑অভ্যুত্থানের পর নারী‑বিরোধী হিংসা ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, “নারীরা এখনো ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছেন; নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তাদের সামাজিক অংশগ্রহণ সীমিত থাকবে।”
জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যায়, নারীদের নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবেশের ওপরও প্রভাব রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী‑সুরক্ষা নীতি ও হিংসা মোকাবিলার জন্য স্পষ্ট পদক্ষেপের দাবি করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনিত তিনটি পৃথক ঘটনা—মোহাম্মদপুরের বাসে জুতা প্রতিবাদ, গৃহহিংসা ও পারিবারিক হত্যাকাণ্ড—একই সময়ে নারীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগকে তীব্র করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে বাস সহকারী কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে, এবং হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করার জন্য অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
এইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীরা দাবি করছেন যে, সরকার ও সমাজ উভয়ই হিংসা প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিকারদের জন্য সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে, নারীরা পাবলিক স্পেসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারবে না এবং তাদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে না।
সামগ্রিকভাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ এবং সাম্প্রতিক ঘটনার বিশ্লেষণ দেখায় যে, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন কেবল আইনি দিক থেকে নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব। হিংসার শিকার নারীদের পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা এবং আইনি সুরক্ষা প্রদান করা জরুরি, যাতে তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, সরকার, নাগরিক সমাজ এবং মিডিয়ার সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার, যাতে নারী‑বিরোধী হিংসা কমে এবং নিরাপদ পরিবেশ গড়ে ওঠে। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা ও নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।



