২৮ ডিসেম্বর ২০০৭ তারিখে নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন সংসদ এক ঐতিহাসিক ভোটের মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থাকে রাজতন্ত্র থেকে ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে ২৪০ বছরের পুরনো শাহ রাজবংশের শাসন শেষ হয় এবং রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে সাধারণ নাগরিকের মর্যাদায় নামিয়ে আনা হয়। ভোটের ফলাফলকে নেপালির জনগণের স্ব-নির্ধারণের চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে গণ্য করা হয়, যদিও প্রজাতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি পরের বছর মে মাসে করা হয়।
শাহ রাজবংশের শাসন নেপালকে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পরিচালনা করেছিল, তবে একুশ শতকের শুরুতে জনগণ প্রজা থেকে নাগরিকের মর্যাদা দাবি করতে থাকে। মাওবাদী বিদ্রোহ এবং ২০০৬ সালের বৃহৎ গণঅভ্যুত্থান, যা ‘জন আন্দোলন‑২’ নামে পরিচিত, রাজা জ্ঞানেন্দ্রের ক্ষমতা হ্রাসের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। এই দুইটি শক্তিশালী আন্দোলনের চাপের ফলে রাজা অবশেষে ক্ষমতা ত্যাগ করে, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে নেপাল এখন থেকে একটি ফেডারেল ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক হবে। এই রূপান্তর কেবল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনই নয়, বরং দেশের সংবিধানিক কাঠামোকে নতুন করে গঠন করার সূচনা করে। ভোটের পরপরই রাজা জ্ঞানেন্দ্রের ভূমিকা সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়, এবং তিনি এখন সাধারণ নাগরিকের সমান অধিকারভোগী হিসেবে গণ্য হন।
কাঠমান্ডু শহরের রাস্তায় সেই দিন হাজারো মানুষ একত্রিত হয়, তাদের মুখে উল্লাসের হাসি এবং চিৎকারে ভরা স্লোগান শোনা যায়। ভিড়ের মধ্যে পুরনো রাজতান্ত্রিক প্রতীকগুলোকে ধ্বংস করার দৃশ্যও দেখা যায়, যা নতুন শাসনব্যবস্থার প্রতি জনগণের দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করে। এই জনসমাবেশকে নেপালির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে জনগণ নিজেরা সরাসরি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়।
প্রজাতন্ত্রের ঘোষণার পর নেপাল সরকার সংবিধান রচনার কাজ শুরু করে, যা ফেডারেল কাঠামো, মৌলিক অধিকার এবং বহু জাতিগত গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গড়ে তোলা হবে। তবে নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জাতিগত স্বার্থের টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় নেপালকে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রয়োজন হবে।
সারসংক্ষেপে, ২৮ ডিসেম্বর ২০০৭ তারিখের ভোট নেপালকে এক নতুন যুগে প্রবেশের দরজা খুলে দেয়, যেখানে রাজতন্ত্রের শেষ এবং গণতান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসনের সূচনা ঘটে। এই পরিবর্তন দেশের রাজনৈতিক দিগন্তকে পুনর্গঠন করবে এবং ভবিষ্যতে নেপালকে একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং গণতান্ত্রিক ফেডারেল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।



