জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ব্যক্তিগত ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবার (এইচএফএ) করদাতাদের জন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ এক মাস বাড়িয়ে ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ নির্ধারণ করেছে। এই পরিবর্তনের ফলে পূর্বের ৩০ নভেম্বরের শেষ তারিখের তুলনায় করদাতারা অতিরিক্ত সময় পাবে এবং কোনো জরিমানা ছাড়াই রিটার্ন দাখিল করতে পারবে। এনবিআর পূর্বেও একই অর্থবছরে সময়সীমা বাড়িয়ে দিয়েছে, তবে এইবার সব করদাতাকে অনলাইন মাধ্যমে জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
বছরের শেষের দিকে সাধারণত রিটার্ন দাখিলের শেষ দিন ৩০ নভেম্বর হয়, তবে এনবিআর প্রায়ই বিভিন্ন কারণে সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়। এইবারের বাড়তি সময়ের মূল উদ্দেশ্য হল করদাতাদের অতিরিক্ত প্রস্তুতির সুযোগ প্রদান এবং ডিজিটাল ফাইলিং প্রক্রিয়ার গ্রহণ বাড়ানো। দেশের মোট ট্যাক্স আইডি নম্বর (টিআইএন) ধারী ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় এক কোটি পনেরো লাখের বেশি, যাদের মধ্যে আয়করযোগ্য আয় থাকলে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক।
অনলাইন রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য করদাতাকে প্রথমে এনবিআরের ই-ফাইলিং সাইটে নিবন্ধন করতে হবে, পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করে তথ্য পূরণ করতে হবে। কাগজের কোনো নথি আপলোডের প্রয়োজন নেই; তবে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের মূল তথ্য সিস্টেমে প্রবেশ করাতে হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো অডিট বা যাচাইয়ের জন্য কপি সংরক্ষণ করতে হবে। এই ডিজিটাল পদ্ধতি করদাতাকে বাড়ি থেকে বের না হয়ে, ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ, রকেট, নগদ বা অন্যান্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি কর পরিশোধের সুবিধা দেয়।
বিস্তৃত সময়সীমা করদাতাদের নগদ প্রবাহে স্বল্পমেয়াদী স্বস্তি এনে দেয়। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সার এবং সেলফ-ইম্প্লয়েডদের জন্য অতিরিক্ত এক মাসের সময় আর্থিক পরিকল্পনা সহজ করে, ফলে দেরি করে জমা দেওয়ার ঝুঁকি কমে। তবে সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে রিটার্নের দেরি মানে কর সংগ্রহের সময়সীমা পিছিয়ে যাওয়া, যা বাজেটের নগদ প্রবাহে সাময়িক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতি আর্থিক সংস্থাগুলোর জন্যও সুযোগ তৈরি করে, কারণ অনলাইন পেমেন্টের ব্যবহার বাড়লে ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
ডিজিটাল ফাইলিংয়ের বাধ্যতামূলকতা এনবিআরের দীর্ঘমেয়াদী ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ। অনলাইন রিটার্নের মাধ্যমে তথ্যের স্বচ্ছতা ও ত্রুটি হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরবর্তীতে অডিট প্রক্রিয়াকে সহজ করবে। একই সঙ্গে, করদাতাদের ডেটা নিরাপত্তা ও সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে, কারণ ই-ফাইলিং সিস্টেমে তথ্য লিকের সম্ভাবনা সর্বদা থাকে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই এক মাসের বাড়তি সময় আর্থিক সেবা প্রদানকারীদের জন্য নতুন গ্রাহক আকর্ষণের সুযোগ তৈরি করে। বিকাশ, রকেট এবং অন্যান্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রিটেইল পেমেন্টের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা দেখে তাদের সেবা উন্নত করতে পারে। ব্যাংকগুলোও অনলাইন ট্রান্সফার ও ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কর পরিশোধের বাড়তি চাহিদা পূরণে সিস্টেম আপডেটের প্রয়োজন অনুভব করবে।
দীর্ঘমেয়াদে এনবিআরের এই ধরনের সময়সীমা বাড়ানোর প্রবণতা করদাতাদের মধ্যে অনিয়মিত দাখিলের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে, যদি না যথাযথ শাস্তি ও প্রণোদনা ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। তাই সরকারকে রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি, সময়মতো দাখিলের জন্য প্রণোদনা (যেমন রিফান্ড দ্রুত প্রদান) ও দেরি করলে কঠোর জরিমানা প্রয়োগের নীতি মেনে চলা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, এনবিআরের এক মাসের সময়সীমা বাড়ানো করদাতাদের জন্য স্বল্পমেয়াদী আর্থিক স্বস্তি এনে দেয়, তবে সরকারের নগদ প্রবাহে সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে। ডিজিটাল ফাইলিংয়ের বাধ্যতামূলকতা আর্থিক সেবা খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে, তবে ডেটা নিরাপত্তা ও সময়মতো রিটার্ন দাখিলের সংস্কৃতি গড়ে তোলার দিকেও মনোযোগ প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এনবিআর যদি এই প্রবণতা বজায় রাখে, তবে কর সংগ্রহের কার্যকারিতা ও ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্য নির্ভর করবে যথাযথ নীতি সমন্বয় ও করদাতাদের সচেতনতার ওপর।



