হন্ডুরাসের রাজধানী টেগুসিগালপায় উবের চালক হিসেবে কাজ করা এলিয়াস পাদিল্লা, এক বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অডকুমেন্টেড অভিবাসী হিসেবে প্রবেশের জন্য টাকা সঞ্চয় করছিলেন। টেগুসিগালপায় ট্রাফিকের জটিলতা ও কম আয়ের কারণে তিনি ১২ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ মাত্র ১২ ডলার (৯ পাউন্ড) উপার্জন করতে পারতেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রে আইসিই (ICE) এজেন্টদের দ্বারা ডিপোর্টেশন দৃশ্য দেখার পর তার পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যায়।
ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) এজেন্টদের দ্বারা বড় শহরে জিপ-টাই দিয়ে গ্রেপ্তার করা অডকুমেন্টেড অভিবাসীদের ছবি মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার ফলে এলিয়াসের মত বহু কেন্দ্রীয় আমেরিকান নাগরিকের মনোভাব পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের এখানে আয় খুবই কম, যুক্তরাষ্ট্রে উবের চালক এক ঘণ্টায় যা উপার্জন করে, তা আমি একদিনে উপার্জন করি।” এই পার্থক্যই তাকে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সম্ভাবনা দেখিয়েছে, তবে ডিপোর্টেশন ভয় তাকে থামিয়ে রেখেছে।
হন্ডুরাসের অধিকাংশ অভিবাসীর প্রধান লক্ষ্য হল রেমিট্যান্সের মাধ্যমে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। এলিয়াসও একই উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, যাতে তিনি তার পরিবারের জন্য নিয়মিত অর্থ পাঠাতে পারেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে গৃহীত কঠোর ইমিগ্রেশন নীতি, বিশেষ করে সীমানা czar টম হোম্যান এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি উপদেষ্টা স্টিভেন মিলারের নেতৃত্বে চালু করা আইসিই অভিযান, তার সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে।
ট্রাম্পের সময়ে লস এঞ্জেলেস, শিকাগো, চার্লট এবং মিনিয়াপোলিসে আইসিই রেইডের লক্ষ্য ছিল কেবলমাত্র অডকুমেন্টেড অভিবাসীদের গ্রেপ্তার নয়, বরং হন্ডুরাসের মতো দেশের মানুষকে উত্তর আমেরিকায় যাওয়া থেকে বিরত রাখা। এই অভিযানগুলোতে গ্রেপ্তারকৃতদের কব্জিতে জিপ-টাই বাঁধা হয় এবং তারা দ্রুত ডিপোর্ট করা হয়, যা মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পায়। সরকারী সূত্র অনুযায়ী, এই রেইডগুলো হন্ডুরাসের অভিবাসী প্রবাহকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে চেয়েছিল।
অপ্রত্যাশিতভাবে, এই কঠোর নীতি হন্ডুরাসের অর্থনীতিতে একটি অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে অডকুমেন্টেড হন্ডুরাসীয়রা, ডিপোর্টেশনের হুমকি অনুভব করে, তাদের হাতে থাকা প্রতিটি ডলার দ্রুত বাড়িতে পাঠাতে শুরু করেছে। ফলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ পূর্বের তুলনায় বহু গুণে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই প্রবাহের ত্বরান্বিত বৃদ্ধি মূলত অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা ও সময়সীমা নিয়ে উদ্বেগের ফলে ঘটেছে।
হন্ডুরাসে হাজারো অডকুমেন্টেড অভিবাসী বর্তমানে তাদের পরিবারকে সমর্থন করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠাচ্ছেন, যদিও তারা নিজেই ডিপোর্টেশনের ঝুঁকিতে আছেন। এই পরিস্থিতি দেশীয় অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অংশ বাড়িয়ে তুলেছে, যা জাতীয় মোট উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করে। তবে একই সঙ্গে, এই প্রবাহের অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা হন্ডুরাসের আর্থিক নীতি গঠনে নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে।
সম্প্রতি হন্ডুরাসে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্টিয়াল নির্বাচনের ফলাফলকে নিয়ে এলিয়াস আশাবাদী। তিনি বলেন, “আমি সরকার পরিবর্তনের পরিণতি দেখার জন্য অপেক্ষা করছি, আশা করি পরিস্থিতি উন্নত হবে।” নতুন সরকার যদি অভিবাসী নীতি বা অর্থনৈতিক সহায়তা প্যাকেজে পরিবর্তন আনে, তবে তা হন্ডুরাসীয়দের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, হন্ডুরাসের অভিবাসী নীতি ও অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ইমিগ্রেশন নীতি হন্ডুরাসের মতো দেশের অভিবাসী প্রবাহকে সাময়িকভাবে কমাতে পারে, তবে রেমিট্যান্সের তীব্র বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে হন্ডুরাসের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে। তারা আরও যোগ করেন, “যদি যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন নীতি পুনর্বিবেচনা না করা হয়, তবে হন্ডুরাসের রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর চাপ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা বাড়বে।” ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন নীতি পুনরায় মূল্যায়ন ও হন্ডুরাসের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন পরিকল্পনা দুটোই এই প্রবণতাকে নির্ধারণ করবে।
মোটের ওপর, আইসিই রেইডের মাধ্যমে ডিপোর্টেশন হুমকি সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও হন্ডুরাসীয় অভিবাসীরা বাড়তি রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহকে শক্তিশালী করেছে। তবে এই প্রবাহের স্থায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন নীতি, হন্ডুরাসের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। আগামী মাসে হন্ডুরাসের নতুন সরকার কী ধরনের অভিবাসী নীতি গ্রহণ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন রেগুলেশন কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা এই প্রবণতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।



