ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে, নারী অধিকার সংগঠন ‘নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে নারীরা’ সরকারকে নির্বাচনের আগে অস্ত্র লাইসেন্সের অনুমোদন স্থগিত করার আহ্বান জানায়। এই দাবি শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) একটি ঘোষণাপত্রে প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনটি মূল দাবি উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম দাবি হল, নির্বাচনী প্রার্থীদের জন্য দ্রুত অস্ত্র লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা, যাতে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাজের দায়িত্ব থেকে সরকার সরে না যায়। দ্বিতীয় দাবি যুবকদের জন্য যুদ্ধ প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নীতির স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি করে, আর তৃতীয়টি রাজনৈতিক হিংসা, হত্যাকাণ্ড, উসকানি এবং গৃহহিংসার স্বতন্ত্র তদন্ত, ন্যায়সঙ্গত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়।
বক্তৃতার সময় নৃবিজ্ঞানী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসরিন সিরাজ গোষ্ঠীর মুখপাত্র হিসেবে বক্তব্য রাখেন। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করে অস্ত্র লাইসেন্সের নীতি প্রণয়ন করা সরকারকে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করেছে এবং এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তিনি সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে মাফিয়া ও বেসরকারি মিলিশিয়া গঠনের সম্ভাবনা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আউটসোর্সিং এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দায়িত্বের বেসরকারিকরণ উল্লেখ করেন।
এই প্রসঙ্গে চারটি মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়। প্রথমে, সরকার কি সক্রিয়ভাবে দেশের অস্ত্রধারী পরিসর বাড়াতে চায়? দ্বিতীয়ত, বেসরকারি চুক্তিভিত্তিক বাহিনী ও মিলিশিয়া গঠন করে সমাজকে আরও সহিংস করতে চায় কি? তৃতীয়ত, যদি অস্ত্রধারী না করা হতো, তবে সরকার এত দ্রুত পদক্ষেপ নিত কি, যখন অন্য ক্ষেত্রে পরিকল্পিত নিষ্ক্রিয়তা দেখা যায়? চতুর্থত, সরকার কি সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর হাতে অস্ত্র সরবরাহের সম্ভাবনা বিবেচনা করে না? এই প্রশ্নগুলো গোষ্ঠীর উদ্বেগের মূল বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
গোষ্ঠী আরও উল্লেখ করে, কিছু প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী ব্যক্তিরা নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবি করলেও, তারা ব্যক্তিগতভাবে অস্ত্র লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। এই বিষয়টি গোষ্ঠীর দৃষ্টিতে সরকারের নীরবতা ও অপ্রতিক্রিয়াশীলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
দুটি গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় বলা হয়, এই পরিকল্পিত পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় শিকার হল বাংলাদেশের প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যেমন নারী, যৌনকর্মী, হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি, পাশাপাশি জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু। গোষ্ঠী এই গোষ্ঠীগুলোর নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার জন্য তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে।
গোষ্ঠীর দাবি অনুযায়ী, সরকারকে অবিলম্বে অস্ত্র লাইসেন্সের অনুমোদন বন্ধ করতে হবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, যুবকদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নীতির স্বতন্ত্র ও স্বাধীন তদন্তের পাশাপাশি, রাজনৈতিক হিংসা ও হত্যাকাণ্ডের ন্যায়সঙ্গত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই দাবিগুলো দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি সরকার গোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে আইনি চ্যালেঞ্জ এবং জনমত সংগ্রহের সম্ভাবনা বাড়বে। এছাড়া, গোষ্ঠীর দাবি ও সরকারের নীতি মধ্যে পার্থক্য রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে, যা নির্বাচনী প্রচারাভিযান ও পার্টির কৌশলে প্রভাব ফেলবে।
গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা ভবিষ্যতে সরকারের নীতি পরিবর্তনের জন্য আইনি পদক্ষেপ, জনসাধারণের প্রতিবাদ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সহায়তা গ্রহণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। তারা উল্লেখ করেন, অস্ত্রধারী সমাজের গঠন ও বেসরকারি মিলিশিয়া গঠনের ঝুঁকি কমাতে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে, দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অবশেষে, গোষ্ঠী সরকারের নীরবতা ও অপ্রতিক্রিয়াশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, এবং দাবি করে যে, প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাদেরও যদি অস্ত্র লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে, তবে তা গোষ্ঠীর দাবির বৈধতা ও গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। গোষ্ঠীর লক্ষ্য হল, নির্বাচনের আগে এবং পরে নিরাপদ, ন্যায়সঙ্গত ও সমতা ভিত্তিক সমাজ গঠন নিশ্চিত করা, যাতে সকল নাগরিক, বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর নিরাপত্তা রক্ষিত থাকে।



