সিলেটের রিকাবি বাজারের কবি নজরুল অডিটরিয়ামে শনিবার দুপুরে জেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত প্রবাসী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। পোস্ট ও টেলিকম মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুন নাসের খান উল্লেখ করেন, সিলেটের এনআরবি (নন‑রেসিডেন্ট বাংলাদেশি) বিনিয়োগ জোনকে নিরাপদ বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য করমুক্ত বিনিয়োগের সুবিধা প্রদান করবে বলে জানান। করমুক্ত সুবিধা পেলে বিদেশি মূলধন সরাসরি সিলেটের শিল্প, সেবা ও অবকাঠামো প্রকল্পে প্রবাহিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা স্থানীয় উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়াবে।
আবদুন নাসের খান আরও উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনৈতিক শক্তি প্রবাসী সম্প্রদায়ের অবদানের ফলে অর্জিত হয়েছে। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহের পাশাপাশি, প্রবাসীরা তাদের সঞ্চয় ও দক্ষতা দেশে নিয়ে এসে নতুন উদ্যোগের সূচনা করতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীও একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। তিনি সিলেটকে লন্ডনের মতো আধুনিক নগরীতে রূপান্তরিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন। নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদানকে তিনি প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন।
চৌধুরী বলেন, রেমিট্যান্স দেশের আর্থিক শক্তির মূল চালিকাশক্তি এবং প্রবাসীরা শুধুমাত্র অর্থ পাঠায় না, তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সুনামও গড়ে তোলেন। এ কারণে সরকার প্রবাসী সম্প্রদায়কে দেশীয় বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে অতিরিক্ত সুবিধা দেবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, সিলেট শহরে ‘প্রবাসী পল্লী’ নির্মাণের কাজ চলছে। এই পল্লিতে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ অবকাঠামো, নিরাপদ বাসস্থান ও ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে, যাতে তারা দেশে ফিরে বিনিয়োগে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
প্রবাসী পল্লি পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, হাই-টেক পার্ক এবং বাণিজ্যিক হাব অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ ধরনের সমন্বিত পরিবেশ স্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্য আকর্ষণীয় হবে, ফলে সিলেটের অর্থনৈতিক পরিসর প্রসারিত হবে।
অনুষ্ঠানে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা উন নবী, পুলিশ সুপার কাজী আখতারুল আলম এবং ১২টি দেশের প্রবাসী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের অংশগ্রহণ প্রবাসী নীতি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নির্দেশ করে।
জেলা প্রশাসন ১৬ নভেম্বর প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সম্মাননা জানাতে আবেদন আহ্বান জানায়। ছয়টি ক্যাটাগরিতে আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখ ৫ ডিসেম্বর নির্ধারিত হয়। এই সময়ে মোট ৫৮২টি আবেদন জমা পড়ে, যার মধ্যে ১০৩ জনকে সম্মাননা দেওয়ার জন্য বাছাই কমিটি নির্ধারণ করে।
ক্যাটাগরিগুলোতে সফল পেশাজীবী, সফল ব্যবসায়ী, সফল কমিউনিটি নেতা, সফল নারী উদ্যোক্তা, খেলাধুলায় সাফল্য অর্জনকারী এবং বিদেশে বাংলাদেশি পণ্য আমদানিকারক অন্তর্ভুক্ত। এই বৈচিত্র্যময় তালিকা দেশের বহুমুখী প্রতিভা ও অর্থনৈতিক অবদানের স্বীকৃতি দেয়।
করমুক্ত বিনিয়োগের সুবিধা ও প্রবাসী পল্লি প্রকল্পের সমন্বয় সিলেটের বাজারে নতুন প্রবাহ আনবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করেন। বিদেশি মূলধনের প্রবেশে রিয়েল এস্টেট, উৎপাদন ও সেবা খাতে চাহিদা বাড়বে, ফলে সম্পত্তির মূল্য ও ভাড়া বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে ঝুঁকি এড়াতে নীতি-নিয়মের স্বচ্ছতা ও কর সুবিধার সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। বিনিয়োগকারীরা করমুক্ত সুবিধা নিয়ে অতিরিক্ত রিটার্নের প্রত্যাশা করতে পারেন, যা যদি বাস্তবায়নে দেরি হয় তবে আস্থা ক্ষয় হতে পারে। তাই সরকারকে সময়মতো প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
সংক্ষেপে, সিলেটের এনআরবি জোনকে করমুক্ত বিনিয়োগের গন্তব্যে রূপান্তর করার উদ্যোগ দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে মূলধনায়নে সাহায্য করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে। তবে নীতি বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সফলতার চাবিকাঠি হবে।



