চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় ২২ বছর বয়সী আবু সুফিয়ানকে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে কুপিয়ে গুরুতর আঘাত হানার ঘটনা গত বুধবার ঘটেছে। শিবগঞ্জের উমরপুর ঘাট এলাকায় স্থানীয় জামায়াত‑ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা শিকারের সঙ্গে হস্তক্ষেপের ফলে এই হিংসাত্মক কাজটি সম্পন্ন করে।
আহত সুফিয়ানের দুই হাত ও এক পা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার আঘাতের তীব্রতা এমন যে প্রথমে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) স্থানান্তর করা হয়েছে।
শিকারের মা সুফিয়া বেগমের মতে, এক কিশোরী আত্মীয়কে উত্ত্যক্তের অভিযোগে শিকারের পরিবারকে হুমকি দেওয়ার পর জামায়াত‑ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা শিকারের বাড়িতে গিয়ে তাকে মারধর ও কুপিয়ে আঘাত করে। শিকারের বাবা রবিউল ইসলাম এই ঘটনার পর শিবগঞ্জ থানা-তে তিনজন নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ১২ থেকে ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ দ্রুত তদন্ত চালিয়ে শিকারের ওপর আঘাতকারী দুইজনকে গ্রেপ্তার করে শিবগঞ্জ জেল কারাগারে পাঠায়। গ্রেপ্তারের নাম প্রকাশিত হয়েছে শাহ আলম (২২) এবং তার বড় ভাই আবদুর রাজ্জাক (২৩)। উভয়ের বাড়ি শ্যামপুর, খোচপাড়া গ্রামে। রাজ্জাক একটি মাদ্রাসার শিক্ষক এবং উমরপুর ঘাটে ওষুধের দোকান পরিচালনা করেন, যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে।
শিকারের মা জানান, কয়েক দিন আগে তাদের কিশোরী আত্মীয়কে এক যুবক অপহরণ করেছিল। সেই ঘটনার পর পুলিশ হস্তক্ষেপ করে কন্যাকে উদ্ধার করে এবং অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করে। তবে অপরাধী জামিনে বেরিয়ে আবার কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করতে থাকে। এ নিয়ে শিকারের বাবা শিকারের মাধ্যমে যুবককে শাসা করতে গিয়ে স্থানীয় জামায়াতের কর্মীরা হস্তক্ষেপ করে শিকারের ওপর হিংসা চালায়।
শিকারের বিবরণে তিনি বলেন, তিনি জামায়াত‑শিবিরের কর্মীদের কাছে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলেন যে তার কিশোরী আত্মীয়কে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে, তবে তারা তার কথা শোনেনি এবং শিকারের হাত‑পা কেটে দেয়ার হুমকি দিয়ে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে কুপিয়ে আঘাত করে।
শিকারের মা আরও উল্লেখ করেন, শিকারের ছেলে যখন আত্মীয়কে বিরক্ত না করতে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, তখনই জামায়াতের কর্মীরা শিকারের বাড়ির সামনে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে তাকে কুপিয়ে আঘাত করে। শিকারের মা শিকারের কথায় জোর দেন, “হাত‑জোড় করে বলেছি, আমি দোষী নই, প্রমাণ চাই, তবু শোনেনি।”
শিবগঞ্জ থানা-র তদন্তকারী অফিসার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং গ্রেপ্তারকৃত দুজনের বিরুদ্ধে হিংসা ও গুলিবিদ্ধের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শিকারের চিকিৎসা অবস্থা স্থিতিশীল হলেও, তার আঘাতের গুরুতরতা বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক পুনর্বাসনের প্রয়োজন হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
স্থানীয় আইনজীবীরা উল্লেখ করেছেন, গ্রেফতারকৃত দুজনের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর আঘাতের মাধ্যমে দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি’ এবং ‘অবৈধভাবে শারীরিক শাস্তি প্রদান’ ইত্যাদি ধারা অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলার অগ্রগতি শিবগঞ্জ থানা-র অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে আপডেট করা হবে।
শিকারের পরিবার বর্তমানে শিকারের চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার জন্য স্থানীয় সামাজিক সংস্থার সাহায্য নিচ্ছে। তারা দাবি করছেন, শিকারের ক্ষতিপূরণ ও শিকারের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
এই ঘটনার পর শিবগঞ্জে নিরাপত্তা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন অতিরিক্ত পুলিশ পেট্রোল বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া, জামায়াত‑ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের স্থানীয় শাখাগুলোর ওপর তদারকি বাড়িয়ে হিংসা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিকারের মামলায় শিবগঞ্জ থানা-র তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের রায়ের অপেক্ষা করা হচ্ছে। মামলাটি স্থানীয় সমাজে নারীর সুরক্ষা ও হিংসা বিরোধী নীতি নিয়ে আলোচনা উস্কে দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাচ্ছে।



