চীন সম্প্রতি একটি পরীক্ষামূলক চালনায় তার সর্বোচ্চ গতি অর্জনকারী ম্যাগলেভ ট্রেনকে ০ থেকে ৭০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতি মাত্র দুই সেকেন্ডে পৌঁছাতে সক্ষম করেছে। এই রেকর্ডটি ৪০০ মিটার দীর্ঘ চৌম্বকিক লেভিটেশন ট্র্যাকে সম্পন্ন হয় এবং গতি অর্জনের পর ট্রেনটি নিরাপদে থামানোও সম্ভব হয়েছে।
পরীক্ষা পরিচালনা করা দলটি প্রায় দশ বছর ধরে এই প্রকল্পে কাজ করে আসছে। গত জানুয়ারি একই ট্র্যাকে তারা ৬৪৮ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতি অর্জন করেছিল, যা এই নতুন রেকর্ডের পূর্ববর্তী সাফল্য হিসেবে উল্লেখযোগ্য। প্রায় ত্রিশ বছর আগে একই বিশ্ববিদ্যালয় চীনের প্রথম যাত্রীবাহী একক-বগি ম্যাগলেভ ট্রেন তৈরি করেছিল, ফলে চীন এই প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনকারী তৃতীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে, এই ট্রেনটি অতিদ্রুত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ত্বরণ, বৈদ্যুতিক সাসপেনশন গাইডেন্স, উচ্চক্ষমতার এনার্জি স্টোরেজ এবং হাই-ফিল্ড সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকের সমন্বয়ে কাজ করে। এসব উপাদান একসাথে চৌম্বকিক লেভিটেশন ও ত্বরণের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে, ফলে ট্রেনটি শূন্য থেকে উচ্চ গতি পর্যন্ত দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। এই প্রযুক্তি হাইপারলুপের মতো ভ্যাকুয়াম-সিল করা টিউবের মধ্যে অতিদ্রুত পরিবহনের সম্ভাবনাও উন্মোচন করে।
ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ত্বরণ পদ্ধতি কেবল ভূস্থল পরিবহনে নয়, মহাকাশ ও বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগযোগ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে। রকেট ও বিমানকে আরও দ্রুত, মসৃণভাবে চলতে সক্ষম করা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা এই প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক উল্লেখ করেছেন, সুপারকন্ডাক্টিং ইলেকট্রিক ম্যাগলেভ সিস্টেমের সফল বাস্তবায়ন চীনের অতিদ্রুত ম্যাগলেভ গবেষণাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। এই সাফল্যের পেছনে থাকা দলটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে বহু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে উচ্চক্ষেত্রের সুপারকন্ডাক্টর এবং শক্তিশালী এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত।
চীনের এই অর্জন আন্তর্জাতিক পরিবহন প্রযুক্তির দিগন্তে নতুন আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। যদি ভবিষ্যতে হাইপারলুপ বা অনুরূপ সিস্টেম বাস্তবায়িত হয়, তবে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রা কয়েক মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে, যা ভ্রমণ সময় ও লজিস্টিক্সের খরচে বিশাল পরিবর্তন আনবে। এছাড়া, শহুরে পরিবহনে ট্রাফিক জ্যাম কমিয়ে পরিবেশগত প্রভাব হ্রাসের সম্ভাবনাও রয়েছে।
এই পরীক্ষার ফলাফল চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি সমর্থনকারী বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাজের সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা ধারাবাহিকভাবে উচ্চগতির পরিবহন, শক্তি দক্ষতা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের সিস্টেমের বাণিজ্যিকীকরণ সম্ভব হয়।
সারসংক্ষেপে, চীনের ম্যাগলেভ ট্রেনের নতুন রেকর্ড কেবল গতি সংক্রান্ত নয়, বরং ভবিষ্যৎ পরিবহন, মহাকাশ ও বিমান শিল্পে সম্ভাব্য রূপান্তরের সূচক। এই প্রযুক্তি যদি সফলভাবে স্কেল আপ করা যায়, তবে তা বিশ্বব্যাপী পরিবহন নেটওয়ার্ককে পুনর্গঠন করতে পারে এবং জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারে।



