২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন রাজনৈতিক দলগুলো ক্রাউডফান্ডিং নামে একটি অনলাইন তহবিল সংগ্রহের পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এই পদ্ধতিতে সমর্থকরা ছোট পরিমাণে অর্থ দান করে প্রার্থীর প্রচারাভিযানকে সমর্থন করে, আর দান গ্রহণকারীকে সাধারণত তা ফেরত দিতে হয় না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুত এবং স্বচ্ছভাবে তহবিল জোগাড়ের এই পদ্ধতি নির্বাচনী অর্থায়নের কাঠামোকে বদলে দিতে পারে।
ক্রাউডফান্ডিং বলতে বোঝায়, বহু সংখ্যক মানুষ স্বেচ্ছায় ছোট পরিমাণে অর্থ প্রদান করে কোনো প্রকল্প, ব্যবসা বা উদ্যোগের জন্য তহবিল গঠন করা। মূলত এটি অনলাইন সাইটের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং দানকারীকে কোনো শেয়ার বা মুনাফা ভাগাভাগি করার বাধ্যবাধকতা থাকে না।
এই তহবিল সংগ্রহের মডেলটি ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায়, যখন ব্যাংক ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে এবং ছোট ব্যবসা ও স্টার্টআপগুলো বিকল্প অর্থের উৎস খুঁজতে থাকে। গ্লোবাল ইকুইটি ক্রাউডফান্ডিং অ্যালায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এই খাতের বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ১৫.৮২ শতাংশের কাছাকাছি হতে পারে।
ইতিহাসে প্রথম সফল ক্রাউডফান্ডিং উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ রক ব্যান্ড মারিলিয়ন তাদের পুনর্মিলনী কনসার্টের জন্য ভক্তদের কাছ থেকে অনলাইন দান সংগ্রহ করেছিল। এই মডেলকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে ২০০১ সালে আর্টিস্টশেয়ার নামের প্রথম শিল্পী-কেন্দ্রিক ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে, যা সঙ্গীত অ্যালবাম ও ট্যুরের জন্য তহবিল সরবরাহ করে।
ভারতে ক্রাউডফান্ডিংয়ের শিকড় তিলক স্বরাজ তহবিলের দিকে খুঁজে পাওয়া যায়, যা মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় গৃহীত হয়। তবে আধুনিক ডিজিটাল ক্রাউডফান্ডিংয়ের উদাহরণ ফান্ডেবলডটকমের রেকর্ডে দেখা যায়, যেখানে ১৯৯৭ সালের পর থেকে বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যবসায়িক প্রকল্পের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্রাউডফান্ডিং প্রথমে বামপন্থী দলগুলো গ্রহণ করে, যেখানে সমর্থকরা সরাসরি পার্টির ক্যাম্পেইন ফান্ডে ছোট দান করে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস “ডোনেট ফর দেশ” শিরোনামে একটি অনলাইন দান অভিযান চালু করে, যা দেশের জন্য দান করার ধারণা দিয়ে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে।
এই বছরের ১২ জানুয়ারি কংগ্রেসের দান প্ল্যাটফর্মে প্রথম দিনেই লক্ষ লক্ষ টাকা সংগ্রহের রিপোর্ট আসে, যা রাজনৈতিক ক্রাউডফান্ডিংয়ের দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা নির্দেশ করে। একই সময়ে অন্যান্য প্রধান দলও অনুরূপ অনলাইন তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুরু করেছে।
তবে এই নতুন পদ্ধতি নিয়ে বিরোধী দলগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করে যে অনলাইন দানের স্বচ্ছতা ও ট্র্যাকিংয়ের অভাব নির্বাচন কোডের লঙ্ঘন ঘটাতে পারে, বিশেষ করে দানকারীর পরিচয় গোপন থাকলে অযৌক্তিক প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে। কিছু বিশ্লেষকও উল্লেখ করেন যে, প্রচলিত তহবিল নিয়ন্ত্রণের কাঠামো এই ডিজিটাল দানকে পর্যাপ্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে ক্রাউডফান্ডিংয়ের ব্যবহারকে তদারকি করার জন্য কিছু নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে দানকারীর নাম, ঠিকানা ও দানের পরিমাণ প্রকাশের বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত। তবে এই নির্দেশিকাগুলো বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত ও আইনি চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে নিয়মের কঠোরতা নির্ধারণ করবে।
বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন, যদি ক্রাউডফান্ডিং নির্বাচনী তহবিলের একটি বড় অংশ দখল করে, তবে প্রচলিত বড় দাতাদের প্রভাব কমে যাবে এবং ছোট দাতাদের অংশগ্রহণ বাড়বে। একই সঙ্গে, তহবিলের উৎস যাচাইয়ের জন্য নতুন ডিজিটাল টুলের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হবে, যাতে অনিয়মিত দান দ্রুত সনাক্ত করা যায়।
সারসংক্ষেপে, ক্রাউডফান্ডিং রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহের একটি আধুনিক পদ্ধতি হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, তবে এর সঙ্গে নির্বাচন কোডের সম্ভাব্য লঙ্ঘন ও স্বচ্ছতার প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে এই নতুন প্রবণতাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনগত কাঠামো ও প্রযুক্তিগত সমাধান গড়ে তুলতে হবে, যাতে নির্বাচনের ন্যায্যতা ও জনসাধারণের বিশ্বাস বজায় থাকে।



