বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজারে এই বছর বিটকয়েনের মূল্য ৬ শতাংশ কমে গেছে, যেখানে স্বর্ণের দাম ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। উভয় সম্পদের গতিবিধি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও পুনর্বিবেচনার সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিজিটাল সম্পদকে একসময় “ডিজিটাল সোনা” বলা হতো। কোভিড‑১৯ মহামারির সময় বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিটকয়েনের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল এবং ট্রাম্পের শাসনামলে ও পরে কিছুটা বাড়তি প্রবণতা দেখিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে স্বর্ণের দামের উত্থান তুলনায় বিটকয়েনের মূল্যবৃদ্ধি বাস্তবায়িত হয়নি।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাত্ত্বিকভাবে বিটকয়েনের দাম স্বর্ণের মতোই বাড়তে পারত, তবে বাজারে তা প্রতিফলিত হয়নি। অনিশ্চয়তার সময় বিনিয়োগকারীরা এখনও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অংশ নেয়, তবে বাস্তবিক রিটার্নে স্বর্ণের দিকে ঝোঁক স্পষ্ট।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এই বছরও অব্যাহত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলান তেলবাহী জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো পদক্ষেপগুলো বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগকে প্রভাবিত করেছে।
ম্যাক্রোইকোনমিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের জাতীয় ঋণ বর্তমানে মোট জাতীয় আয়ের ১২৫ শতাংশ, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১৪৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস। এই ঋণের মাত্রা ইতালি ও গ্রিসের মতো দেশের ঋণ স্তরের চেয়েও বেশি।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিটকয়েনকে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এআই-সম্পর্কিত সম্পদের অতিমূল্যায়ন নিয়ে বিতর্কের মাঝেও, এআই চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া শেয়ারের দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রযুক্তি সেক্টরের শক্তি নির্দেশ করে। কিছু বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, এআইয়ের উত্থান বিটকয়েনের জন্য নতুন প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি ক্রিপ্টো বাজারে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ক্রিপ্টো-এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) চালু করছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিজিটাল সম্পদে প্রবেশের সহজ পথ তৈরি করেছে। এই ধাপটি বিটকয়েনকে মূলধারার আর্থিক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ক্রিপ্টো বাজারের কিছু অংশে কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিয়েছে। তারা বাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত তদারকি চায়। এই নিয়ন্ত্রক দৃষ্টিভঙ্গি বিটকয়েনের দামের পতনের একটি কারণ হিসেবে বিশ্লেষিত হচ্ছে।
বিটকয়েনের মূলধারার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও, জেপি মরগ্যান, ব্ল্যাকরক ইত্যাদি বড় সংস্থা এটিকে সাধারণ সম্পদশ্রেণি হিসেবে উল্লেখ করলে তার বিপ্লবী স্বভাব কিছুটা হারিয়ে যায়। ফলে, বিনিয়োগকারীরা এটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে নয়, বরং একটি ঐতিহ্যবাহী সম্পদের বিকল্প হিসেবে দেখছে।
বাজারের এই পরিবর্তনগুলো স্বর্ণের প্রতি পুনরায় আগ্রহের দিকে ইঙ্গিত করে। স্বর্ণের দাম ৭১ শতাংশ বেড়েছে, যা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে তার আকর্ষণ বাড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন বাস্তবিক সম্পদে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন, যা ডিজিটাল সোনার চাহিদা কমিয়ে দেয়।
সারসংক্ষেপে, এই বছর বিটকয়েনের মূল্য হ্রাস এবং স্বর্ণের উত্থান বিনিয়োগের পছন্দে স্পষ্ট পরিবর্তন নির্দেশ করে। মুদ্রা নীতি, ঋণ স্তর, প্রযুক্তি প্রবণতা এবং নিয়ন্ত্রক নীতিমালা সবই এই গতিবিধিতে প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যতে বিটকয়েনের মূল্য পুনরায় উত্থান পেতে হলে এই উপাদানগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দরকার।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদিও ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং নিয়ন্ত্রক সমর্থন রয়েছে, তবু স্বর্ণের মতো ঐতিহ্যবাহী সম্পদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এখনও বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রধান পছন্দ। তাই, বাজারের অস্থিরতা এবং মুদ্রা নীতির পরিবর্তনকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।



