চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলায় অবস্থিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উড়িরচরের বাসিন্দারা এখনও পুরোনো পদ্ধতিতে তথ্য গ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। বাজারের দু’প্রান্তে উঁচু খুঁটির সঙ্গে যুক্ত দুটি লাউডস্পিকার, স্থানীয়ভাবে ‘এলান মাইক’ নামে পরিচিত, নিয়মিতভাবে পণ্য, যাত্রীবাহী ট্রলার, আবহাওয়া এবং জরুরি সতর্কতা সহ নানা ঘোষণা শোনায়।
উড়িরচর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরবালুয়া গ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত, এবং উভয় এলাকায় মোট সাতটি বাজার রয়েছে। এদের মধ্যে চারটি—জনতা বাজার, বাতানি বাজার, বাংলা বাজার ও কলোনি বাজারে এলান মাইকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি বাজারের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে মাইকের জন্য খুঁটি স্থাপন করা থাকে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দারা টাকার বিনিময়ে ঘোষণার সেবা গ্রহণ করেন।
মাইকে ঘোষণার কাজটি এক ব্যক্তি পরিচালনা করেন। প্রথমে তাকে ঘোষণার বিষয়বস্তু জানানো হয়, এরপর তিনি মাইকে শব্দ পাঠিয়ে চারপাশে শোনাতে সাহায্য করেন। এই প্রক্রিয়ায় বাঁশের মতো ঘূর্ণায়মান যন্ত্র ব্যবহার করে শব্দকে বিস্তৃত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। ঘোষণার পরিধি প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার, যা উড়িরচর ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে।
ডিজিটাল যোগাযোগের বিকাশ সত্ত্বেও, উড়িরচরের মানুষ এখনও লাউডস্পিকারের ওপর বেশি বিশ্বাস রাখেন। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তথ্য পাওয়া গেলেও, মাইকের মাধ্যমে শোনা ঘোষণাই অধিক বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এই প্রবণতা স্থানীয় বাসিন্দা মো. রুবেল উল্লেখ করেন, যিনি প্রায় চার দশক ধরে এই সেবা চালিয়ে আসছেন। তার পিতা মো. শহিদুল্লাহ পূর্বে এই কাজটি পরিচালনা করতেন; পিতার অবসরের পর থেকে রুবেলই একা ঘোষণার দায়িত্বে আছেন।
রুবেল জানান, এক সময় প্রতি ঘোষণার জন্য ৫ থেকে ১০ টাকা নেওয়া হতো, তবে এখন তা ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে পরিবর্তিত হয়েছে। এই মূল্য বৃদ্ধি মূলত ঘোষণার বিষয়বস্তু ও জরুরি স্বভাবের ওপর নির্ভরশীল। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মাইকের মাধ্যমে শোনা তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের তুলনায় বেশি, ফলে স্থানীয় ব্যবসা ও জরুরি সেবার সমন্বয় সহজ হয়।
জনতা বাজারের পশ্চিম পাশে আরেকটি মাইক পরিচালনা করেন মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। তিনি প্রায় দশ বছর ধরে এই সেবা প্রদান করছেন এবং একইভাবে বাসিন্দাদের কাছ থেকে ঘোষণার জন্য অর্থ গ্রহণ করেন। উড়িরচর ও চরবালুয়া অঞ্চলের মোট সাতটি বাজারের মধ্যে চারটিতে এই ধরনের লাউডস্পিকারের ব্যবস্থা রয়েছে, যা স্থানীয় তথ্যপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল মিডিয়ার বিস্তারের পরেও, উড়িরচরের মতো দূরবর্তী ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী যোগাযোগের পদ্ধতি এখনও কার্যকর। এলান মাইকের মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে তথ্য পৌঁছানোর ক্ষমতা, বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে, স্থানীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে ডিজিটাল সেবার সঙ্গে এই পুরোনো পদ্ধতির সমন্বয় ঘটলে তথ্যের প্রবেশগম্যতা আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়।



