চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো (NBS) নভেম্বর মাসে শিল্পখাতের মুনাফা পূর্ব বছরের তুলনায় ১৩.১ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে, যা গত এক বছরেও না দেখা সর্বোচ্চ হ্রাস। অক্টোবর মাসে মুনাফা ৫.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল, ফলে এই পতন পূর্বের হ্রাসের চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুত।
মুনাফার এই তীব্র পতনের পেছনে মূলত দেশীয় চাহিদার দুর্বলতা রয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক রপ্তানি পরিসংখ্যান প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল দেখিয়েছে। একই সঙ্গে, কারখানা-গেটে চলমান মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের ফলে উৎপাদন খরচ কমলেও বিক্রয় মূল্যে চাপ বজায় রয়েছে, যা মোট মুনাফা হ্রাসে ভূমিকা রাখে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা চতুর্থ ত্রৈমাসিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি ধীর হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে গৃহস্থালী ব্যয়ের স্থবিরতা এবং ভোক্তা আত্মবিশ্বাসের হ্রাস নীতিনির্ধারকদের অতিরিক্ত উদ্দীপনা প্যাকেজের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সিনিয়র ইকোনমিস্ট শু টিয়ানচেন উল্লেখ করেছেন, যদিও শিল্প মুনাফা হ্রাসের গতি তীব্র, তবু তিনি সামগ্রিক দৃষ্টিতে সতর্ক আশাবাদী। তিনি বলেন, “বিনিয়োগের পরিমাণ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুনাফা পুনরুদ্ধার হতে পারে, এবং কিছু কোম্পানি বিদেশি বাজারে লাভ বাড়াতে পারে, যদিও তা বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগীদের তুলনায় চ্যালেঞ্জপূর্ণ।”
বছরের প্রথম ১১ মাসে শিল্প মুনাফা সামান্য ০.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১.৯ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর। এই ধীরগতি মূলত কয়লা খনন ও ধোয়া শিল্পের মুনাফা ৪৭.৩ শতাংশ হ্রাসের ফলে ঘটেছে।
চীনের মোট অর্থনীতির আকার প্রায় ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, তবে বছরের শেষের দিকে এই বিশাল অর্থনীতির গতি হ্রাস পেয়েছে। সরকার এখনও নতুন নীতি সমর্থন প্রকাশ করেনি, যা বাজারের প্রত্যাশা ও বাস্তব চাহিদার মধ্যে ফাঁক বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, বেইজিং ২০২৫ সালের জন্য প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং বর্তমান সূচকগুলো থেকে দেখা যায় এই লক্ষ্য এখনও অর্জনযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যিক উত্তেজনা হ্রাস পেয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
তবে, নীতি সমর্থনের ঘাটতি এবং গৃহস্থালী ব্যয়ের স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট, গৃহস্থালী ভোগ্যপণ্যের চাহিদা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের আর্থিক অবস্থা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
শিল্পক্ষেত্রে মুনাফার হ্রাসের ফলে ব্যাংক ঋণ প্রদানের শর্ত কঠোর হতে পারে, যা উৎপাদন খাতের নগদ প্রবাহে চাপ বাড়াবে। একই সঙ্গে, রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে কিছু উচ্চ প্রযুক্তি ও পণ্যশ্রেণীর জন্য বিদেশি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, তবে তা আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় উচ্চ খরচে হতে পারে।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারকদের জন্য এখন সময় এসেছে, কীভাবে ভোক্তা ব্যয় উদ্দীপনা, কর হ্রাস বা সরাসরি শিল্পে সহায়তা প্রদান করে মন্দা থেকে বেরিয়ে আসা যায় তা নির্ধারণ করা। বিশেষ করে, গৃহস্থালী আয়ের বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, চীনের শিল্প মুনাফা নভেম্বর মাসে দ্রুত হ্রাস পেয়েছে, যা দেশীয় চাহিদার দুর্বলতা এবং মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের প্রভাবের ফল। যদিও রপ্তানি কিছুটা সান্ত্বনা দিয়েছে, নীতি সমর্থনের অভাব এবং গৃহস্থালী ব্যয়ের স্থবিরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নীতিনির্ধারকদের দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হবে।



