পাঙাশ মাছের কাঁটাবিহীন মাংস, যাকে বাচা ফিলে বলা হয়, তা প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় বাজারে সরবরাহকারী নুইভাফর্মের প্রতিষ্ঠাতা আবু মঞ্জুর সাঈফের ব্যবসা গত ছয় মাসে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। টঙ্গীর শিলমুন এলাকায় ৪,০০০ বর্গফুট জায়গায় গড়ে ১৩ জন কর্মীসহ একটি কারখানা চালু করে তিনি জুন মাস থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেন। দেশের হোটেল, রেস্তোরাঁ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোতে এই ফিলের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রয়ও তীব্র গতিতে বেড়েছে।
আবু মঞ্জুর সাঈফের পেশাগত যাত্রা সরকারি চাকরি থেকে শুরু হয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও কর্মজীবনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে ১৯৯৭ সালে স্নাতক এবং ১৯৯৯ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। অস্ট্রেলিয়ার একটি টেলিকম কোম্পানিতে দেড় বছর কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তিনি দেশে ফিরে উদ্যোক্তা পথে পা বাড়ান।
নুইভাফর্মের উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমানে মাসে এক হাজার কেজির বেশি বাচা ফিলে, যার বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। কারখানায় দৈনিক গড়ে ৪০ কেজি ফিলে উৎপাদন হয়, যা স্থানীয় হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে সরবরাহ করা হয়। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বাকি মাছের উপজাতগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, ফলে কাঁচামালের খরচ কমে এবং পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতামূলক থাকে। এই মডেলটি যদি স্কেল আপ করা যায়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
নুইভাফর্মের পণ্য বর্তমানে আইএসডি স্কুল, কোরিয়ানা রেস্টুরেন্ট, ধাবা, তারকা, রাওয়া ক্লাব এবং কর্নেলস কেবিনসহ ত্রিশেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সরবরাহ করা হয়। বড় হোটেল ও একটি সুপারশপের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তি নিয়ে আলোচনাও চলছে, যা বিক্রয় পরিসরকে আরও বিস্তৃত করবে। দেশের অভ্যন্তরে বর্তমানে বাচা ফিলে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা হয়, যেখানে প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকা মূল্যে বিক্রি হয়। স্থানীয় উৎপাদন এই দামের তুলনায় কম খরচে পণ্য সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি করে।
বাচা ফিলে তৈরিতে ব্যবহৃত প্যাঙ্গাসিয়াস গোত্রের ক্যাটফিশ, যা দেশে পাঙাশ নামে পরিচিত, তার চাহিদা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো কাঁটাবিহীন মাংসের স্বাদ ও গুণগত মানকে গুরুত্ব দিচ্ছে, ফলে এই পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে ফ্রিজার ও অন্যান্য যান্ত্রিক সরঞ্জাম আমদানি করার পরিকল্পনা নুইভাফর্মের রয়েছে, যা দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে বাজারের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে।
উদ্যোক্তা উল্লেখ করেন, মাছের উপজাতগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ কমে এবং পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ পণ্যকে রপ্তানি-উদ্যোগের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, যেমনটি গার্মেন্টস শিল্পের ক্ষেত্রে হয়েছে। নীতি নির্ধারকরা যদি উৎপাদন সুবিধা, রপ্তানি প্রণোদনা এবং মান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা প্রদান করেন, তবে বাচা ফিলে রপ্তানি শিল্পে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাচা ফিলের চাহিদা মৌসুমী পরিবর্তনের তুলনায় স্থিতিশীল এবং হাই-এন্ড রেস্টুরেন্টে এর ব্যবহার বাড়ছে। তবে সরবরাহ শৃঙ্খলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও গুণগত মান বজায় রাখার জন্য আধুনিক ফ্রিজার ও প্যাকেজিং প্রযুক্তি অপরিহার্য। এই প্রযুক্তি না থাকলে পণ্যের শেলফ লাইফ কমে যায়, যা রপ্তানি সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। তাই সরঞ্জাম আমদানি ও প্রযুক্তি আপগ্রেডকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
আবু মঞ্জুর সাঈফের ব্যবসা মডেলটি স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে মূল্য সংযোজনের একটি উদাহরণ। পাঙাশের প্রচুর সরবরাহ এবং কম শ্রম খরচের সুবিধা নিয়ে তিনি উচ্চ মানের বাচা ফিলে উৎপাদন করে বাজারে প্রবেশ করেছেন। এই মডেলটি অন্যান্য মাছের প্রক্রিয়াকরণ শিল্পেও পুনরায় প্রয়োগ করা যেতে পারে, যা সামগ্রিক মাছ শিল্পের উন্নয়নে সহায়তা করবে।
ভবিষ্যতে নুইভাফর্মের লক্ষ্য উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ করা এবং রপ্তানি বাজারে প্রবেশ করা। ফ্রিজার, প্যাকেজিং লাইন এবং লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য বিদেশি সরঞ্জাম আমদানি পরিকল্পনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। যদি সরকারী সহায়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটে, তবে বাচা ফিলে রপ্তানি শিল্পে নতুন রপ্তানি পণ্য হিসেবে স্থান পাবে, যা দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে অবদান রাখবে।



