ব্রহ্মপুত্রের মাঝখানে, পাকা সড়ক ও স্থায়ী বাজারের অনুপস্থিতিতে, কুরিগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলায় দাইকাওয়া চর একটি দূরবর্তী কৃষিকেন্দ্র। এখানে ৭০টিরও বেশি পরিবার কৃষিকাজে নির্ভরশীল, যেখানে বয়স ৬৫‑৭৫ বছর পর্যন্ত কৃষকরা বার্ষিক নদীর স্রোতে জমি হারানো‑পাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
দৈনন্দিন জীবনের ভিত্তি হল ধান, ভুট্টা, পাট, কাউন, গম, চেনা এবং ডাল ইত্যাদি ফসল, যা নদীর বালি‑সিল্টের ওপর নির্ভর করে চাষ করা হয়। কখনো স্রোত জমি কেটে নেয়, আবার নতুন সিল্ট জমা হয়ে নতুন ক্ষেত তৈরি করে। এই অনিয়মিততা কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনাকে কঠিন করে তোলে, তবে তারা প্রাকৃতিক সম্পদকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করার চেষ্টা করে।
বাজারের অভাব দাইকাওয়া চরকে আরেকটি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। ফসল কাটার পর কৃষকরা গাঁথা গাঁথা থলে নিয়ে নৌকায় চড়ে নদীর তীরে অস্থায়ী হাটে পৌঁছায়, যাকে চর হাট বলা হয়। এই হাটগুলো কয়েক ঘন্টার জন্যই খোলা থাকে এবং নদীর পাড়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থানও বদলে যায়। মূল ভূখণ্ডের বাজারের তুলনায় এখানে পণ্যের দাম কম, আর প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার দাম বেশি।
স্থানীয় কৃষক জাভেদ আলি জানান, “ফসল উৎপাদনের চেয়ে বিক্রয় করা বেশি কঠিন। আমরা নৌকায় ভরে হাটে নিয়ে যাই, কিন্তু দাম মূল ভূখণ্ডের চেয়ে ৮‑১০ শতাংশ কম। একই সঙ্গে, দৈনন্দিন জিনিসপত্রের দাম ৮‑১০ শতাংশ বেশি। এই পার্থক্য আমাদের প্রতি মৌসুমে ক্ষতি করে।” এই মূল্য পার্থক্য সরাসরি কৃষকদের আয়কে হ্রাস করে এবং তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে।
অন্যদিকে, ৭৫ বছর বয়সী আজগর আলি মন্ডল, যিনি একই চরেই বাস করেন, উল্লেখ করেন যে এই বৈষম্য বহু বছর ধরে চলমান। তিনি বলেন, “চর হাটে বিক্রয়‑ক্রয় অনুপাত সবসময়ই আমাদের জন্য অনুকূল নয়; মূল বাজারের তুলনায় আমরা কমে বিক্রি করি, বেশি দামে কিনতে বাধ্য হই।” এই দীর্ঘস্থায়ী মূল্য বৈষম্য স্থানীয় অর্থনীতিতে কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে পরিবহন অবকাঠামোর অভাব এবং বাজারের অস্থিতিশীলতা মূল কারণ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, দাইকাওয়া চর কৃষকদের জন্য একটি অনন্য বাজার চেইন তৈরি করেছে, তবে এই চেইনটি কার্যকর নয়। নৌকায় মালামাল পরিবহন, হাটের অস্থায়ী প্রকৃতি এবং মূল্য পার্থক্য সবই লেনদেনের খরচ বাড়িয়ে দেয়। ফলে, উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত আয় কমে যায়, যা কৃষকদের ঋণগ্রস্ত করে এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা হ্রাস করে।
বাজারের এই অসমতা দূর করতে অবকাঠামো উন্নয়ন অপরিহার্য। স্থায়ী রোড, সেতু এবং নিয়মিত বাজারের প্রতিষ্ঠা করলে কৃষকরা সরাসরি মূল ভূখণ্ডের ক্রেতাদের সঙ্গে লেনদেন করতে পারবে, যার ফলে মধ্যস্থতাকারীর মার্জিন কমে দাম সমতা বজায় থাকবে। এছাড়া, সরকারী বা বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের তত্ত্বাবধান এবং গুদাম সুবিধা প্রদান করলে ফসলের সংরক্ষণ ও সময়মতো বিক্রয় সম্ভব হবে।
ব্রহ্মপুত্রের পরিবর্তনশীল প্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে চর‑হাটের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। স্রোতের তীব্রতা বাড়লে ভূমি ক্ষয় দ্রুত হতে পারে, ফলে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং বাজারের চাহিদা কমে যাবে। অন্যদিকে, সিল্টের নতুন জমি গঠন হলে নতুন ফসলের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, তবে তা সঠিক পরিকল্পনা ও সমর্থন ছাড়া টেকসই হবে না।
সারসংক্ষেপে, দাইকাওয়া চর‑হাটের বর্তমান অবস্থা কৃষকদের জন্য একটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের উদাহরণ। মূল্য বৈষম্য, পরিবহন সীমাবদ্ধতা এবং বাজারের অস্থায়িত্বের কারণে উৎপাদন থেকে আয় পর্যন্ত সব স্তরে ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান করতে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাজারের নিয়মিততা এবং মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে চর‑অঞ্চলের কৃষকরা তাদের উৎপাদনকে সঠিক মূল্যে বিক্রি করে আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে।



