সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দুই কোটি শিক্ষার্থী ধারাবাহিক পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার ধারায় ব্যাঘাতের সম্মুখীন। এই পরিবর্তনগুলো গত চার বছরে চারবার ঘটেছে, যা শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষের সঞ্চার করেছে।
২০১৯-২০২৩ সময়ে সরকার তিনবার পাঠ্যক্রম সংশোধন এবং চারবার মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে। প্রতিটি পরিবর্তনই শিক্ষার্থীদের নতুন সিলেবাসে অভিযোজিত হতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে, ফলে শিক্ষার গুণগত মানে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গৃহীত অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পাঠ্যক্রমকে এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাতিল করে দেয় এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনে। এই দ্রুত সিদ্ধান্ত শিক্ষাব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করেছে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছে।
নতুন পাঠ্যক্রমের প্রথম আট মাসে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত বার্ষিক পরীক্ষায় পুরনো সৃজনশীল পদ্ধতিতে বসতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা দুইটি ভিন্ন সিলেবাসের মধ্যে দ্বন্দ্বে পড়ে, যা তাদের প্রস্তুতিতে অতিরিক্ত জটিলতা যোগ করেছে।
২০২৫ শিক্ষাবর্ষে নতুন পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। তবে সরকার ২০২৭ সাল থেকে বৃহত্তর পাঠ্যক্রম সংস্কার পরিকল্পনা করেছে, যার মধ্যে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই পরিকল্পনা এখনও প্রস্তাবনা পর্যায়ে, ফলে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সময়সীমা অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের প্রস্তাব বছরের শেষের দিকে জমা দিয়েছে। শিক্ষাবিদরা এই প্রস্তাবকে অতিরঞ্জিত বলে সমালোচনা করেছেন, কারণ ধারাবাহিক পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মানসিক ও একাডেমিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।
অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা চার বছরে চারবার মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা উল্লেখ করে, বারবার পরিবর্তিত শিক্ষাপদ্ধতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার আগ্রহ কমিয়ে দেয় এবং কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে তা নিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ায়।
ধারাবাহিক পরিবর্তনের ফলে কিছু পরিবারে মানসিক চাপের মাত্রা বাড়ে। রাজধানীর একটি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীর মা জানান, বার্ষিক পরীক্ষার আগে সন্তানকে বসাতে চাইলে শিশুটি কাঁদে, পাঁচটি লাইনও মুখস্থ করতে পারে না এবং মানসিক চাপের শিকার হয়। এ ধরনের অভিজ্ঞতা পরিবারে উদ্বেগের সঞ্চার করে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, ধারাবাহিক পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। হঠাৎ বেশি চাপ দেওয়া শিক্ষার্থীর মনোভাব ও শিখন ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে; ধীরে ধীরে এবং সুশৃঙ্খলভাবে নতুন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত করা জরুরি।
শিক্ষাবিদরা বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘অত্যন্ত জটিল’ বলে উল্লেখ করে, কারণ বারবার পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পরিবর্তন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে বিচ্যুত করে। তারা ফলাফলভিত্তিক পাঠ্যক্রম এবং স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরছেন, যাতে নীতি নির্ধারণে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) এই পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করে এবং ভবিষ্যৎ নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো সময়সূচি প্রকাশিত হয়নি, যা শিক্ষার্থীদের জন্য অনিশ্চয়তা বজায় রাখে।
শিক্ষা সংক্রান্ত ধারাবাহিক পরিবর্তনের মুখে অভিভাবকদের জন্য একটি ব্যবহারিক পরামর্শ: সন্তানকে দৈনন্দিন রুটিনে ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে ধীরে ধীরে নতুন বিষয়বস্তু শিখতে সাহায্য করুন, এবং মানসিক চাপ কমাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও শখের সময় নিশ্চিত করুন। আপনার সন্তান কীভাবে এই পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।



