ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতান্যাহু আগামী রবিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের মার-এ-লাগো রিসোর্টে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এই সফরের মূল বিষয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রাম, যা ইসরায়েল ও তার যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মতে তাত্ক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করছে। নেতান্যাহু ইতিমধ্যে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইরানের সম্ভাব্য আক্রমণাত্মক আচরণ সম্পর্কে সতর্কতা জানিয়ে আসছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক সুবিধা বোমাবর্ষণ করে সেই সতর্কতাকে সমর্থন করেছিলেন, এখন আবার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন। ট্রাম্পের পূর্ববর্তী পদক্ষেপের পরেও নেতান্যাহু আরও কঠোর নীতি চায় বলে সূত্রগুলো জানাচ্ছে।
ইসরায়েলি সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পকে অবিলম্বে মোকাবেলা করার দাবি জানিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুদ্ধের সুর তুলেছেন। তারা যুক্তি দেন যে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা অপরিহার্য।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করছেন যে ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘর্ষ ট্রাম্পের বর্তমান বৈদেশিক নীতি লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। ট্রাম্পের প্রশাসন বর্তমানে ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার দিকে মনোনিবেশ করেছে।
সিনা তুসি, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি থিংক ট্যাঙ্কের সিনিয়র ফেলো, উল্লেখ করেছেন যে ট্রাম্পের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারগুলো ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক মোকাবেলা থেকে আলাদা। তুসি বলেন, নেতান্যাহুর লক্ষ্য ইরানের ওপর দীর্ঘমেয়াদী সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের ইচ্ছার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।
তুসি আরও যোগ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে অবিরত সামরিক জড়িততা ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের ইচ্ছা প্রকাশ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এখন এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার দিকে, যেখানে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন কমে।
গাজা অঞ্চলে সাময়িক চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে, ট্রাম্প নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি রক্ষাকারী হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তিনি দাবি করেন, তার উদ্যোগের ফলে ৩,০০০ বছরের পর প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই দাবি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্কের বিষয়।
ট্রাম্পের প্রশাসন সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যকে “সহযোগিতা, বন্ধুত্ব ও বিনিয়োগের স্থান” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই নথিতে অঞ্চলকে আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে না দেখিয়ে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।
নেতান্যাহুর মার্কিন সফর এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নীতি নিয়ে আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের নীতি দিকনির্দেশে সম্ভাব্য টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়। যদি ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে যুক্ত করার চেষ্টা করে, তবে তা ট্রাম্পের শান্তি ও স্থিতিশীলতা লক্ষ্যের সঙ্গে সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, এই বৈঠকের ফলাফল ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার না দেন, তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে নতুন সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সরকার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি কমাতে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের সমর্থন চাচ্ছে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা সীমাবদ্ধ না করা হলে ইসরায়েল ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সারসংক্ষেপে, নেতান্যাহু ও ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নীতি নিয়ে দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কূটনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ইসরায়েলের সামরিক নিরাপত্তা চাহিদার মধ্যে সমন্বয় কিভাবে হবে, তা আগামী সপ্তাহে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।



