সিরিয়ার হোমস শহরের ওয়াদি আল-দাহাব পাড়া অবস্থিত আলী ইবনে আবি তলিব মসজিদে শুক্রবারের নামাজের সময় একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এই ঘটনার ফলে কমপক্ষে আটজনের মৃত্যু এবং অষ্টাদশজনের গুরুতর আঘাত হয়েছে। ঘটনাস্থলে জরুরি সেবা দল দ্রুত পৌঁছে আহতদের চিকিৎসা শুরু করে।
মসজিদে প্রবেশের পর দেখা যায় অভ্যন্তরের দেয়াল কালো দাগে ঢাকা, জানালাগুলি ভেঙে ছড়িয়ে আছে এবং কার্পেটের ওপর রক্তের দাগ ছড়িয়ে রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা সানা প্রকাশিত ছবিগুলো এই ধ্বংসাবশেষকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি যে মসজিদের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে নিরাপত্তা সূত্রের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, বিস্ফোরণটি মসজিদের ভিতরে স্থাপিত এক বিস্ফোরক থেকে ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো দায়ী ব্যক্তিদের সনাক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর মতে, এই ধরনের আক্রমণ পূর্বে অল্প সংখ্যক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তাই এই ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
সিরিয়ার জিহাদি গোষ্ঠী সারায়া আনসার আল-সুন্নাহ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। গোষ্ঠী দাবি করে যে তারা অপরিচিত একটি সঙ্গী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে মসজিদে বিস্ফোরক বসিয়েছিল। তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই কাজটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য করা হয়েছে।
সারায়া আনসার আল-সুন্নাহের উত্স ও সংযোগ সম্পর্কে এখনও স্পষ্টতা নেই। গোষ্ঠীটি প্রথমবারের মতো জুন মাসে দমাস্কাসের একটি গির্জা বোমা হামলার দায় স্বীকার করার পর থেকে নজরে এসেছে। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করে যে এই গোষ্ঠী আইএসের সঙ্গে সমন্বয় থাকতে পারে, কারণ তাদের লক্ষ্য ও প্রচারাভিযান আইএসের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে গোষ্ঠীর প্রকৃত সংযোগ এখনও তদন্তাধীন।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতি দিয়ে এই ঘটনার নিন্দা প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, এই ধরনের নির্দয় কাজ মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি আক্রমণ এবং দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
বিস্ফোরণস্থল ওয়াদি আল-দাহাব পাড়া প্রধানত আলাউয়াত সম্প্রদায়ের বাসস্থান। আলাউয়াত শিয়া ইসলামের একটি শাখা, যা সিরিয়ার বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর একটি। এই পাড়ার বাসিন্দারা পূর্বে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেক্টারিয়ান হিংসার শিকার হয়ে আসছেন, ফলে তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রাথমিক তদন্তের পাশাপাশি, সিরিয়ার নিরাপত্তা বিভাগ ও বিচার বিভাগ ঘটনাটির ওপর একটি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট সকল প্রমাণ সংগ্রহ, সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার এবং আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততর করার দায়িত্বে থাকবে। আদালতে মামলার শোনার তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই হামলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সেক্টারিয়ান সহিংসতার একটি নতুন রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক বছর আগে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর, আলাউয়াত সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ বাড়ে এবং তারা প্রতিশোধের আশঙ্কা করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গোষ্ঠীটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী ও সরকারী অবশিষ্টদের লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি আক্রমণ চালিয়েছে, যা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী এখনো এই ধরনের আক্রমণ রোধে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে। মসজিদে ঘটিত এই ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরণ দেশের ধর্মীয় স্থাপনা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই ধরনের সেক্টারিয়ান হিংসা বন্ধের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে।



