সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭৫৪,৬৮১ টন সয়াবিন আমদানি করেছে, যা একই সময়ে গত বছর তুলনায় ৩১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিমাণের উত্থান দেশীয় সয়াবিন চাহিদা পূরণে এবং বাণিজ্যিক ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মার্কিন সয়াবিন রপ্তানি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, নতুন মার্কেটিং বছর (সেপ্টেম্বর থেকে আগস্ট) এর প্রথম এগারো সপ্তাহে এই বিশাল বৃদ্ধি ঘটেছে। এই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের দাম তুলনামূলকভাবে কম ছিল, যা বাংলাদেশি আমদানিকারকদের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করেছে।
দামের এই সুবিধা মূলত চীনের সাময়িক ক্রয় বন্ধের ফলে উদ্ভূত হয়। চীন উচ্চতর পারস্পরিক শুল্কের প্রতিবাদে প্রথমার্ধে আমেরিকান সয়াবিনের ক্রয় বন্ধ করে দেয়, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা অতিরিক্ত মজুদে আটকে যায় এবং বাজারে সরবরাহ বাড়ে। এই পরিস্থিতি সয়াবিনের আন্তর্জাতিক মূল্যে নিম্নগামী প্রবণতা তৈরি করে।
চীন অক্টোবর মাসে নতুন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় পুনরায় ক্রয় শুরু করার পরও, বাংলাদেশি বেসরকারি সংস্থা ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সস্তা সয়াবিনের সুবিধা গ্রহণ করে বাজারে প্রবেশ করেছে। ফলে দেশীয় সয়াবিনের সরবরাহ স্থিতিশীল হয়েছে এবং মূল্য দমন হয়েছে।
সয়াবিনের পাশাপাশি বাংলাদেশি বেসরকারি খাত যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, গম এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানিও বাড়িয়ে তুলেছে। এই পদক্ষেপগুলো দু’দেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি কমানোর দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরকার আগস্ট মাসে বাংলাদেশি পণ্যের উপর পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে কমিয়ে দেয়। শুল্ক হ্রাসের ফলে বাংলাদেশি রপ্তানির প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়ে এবং আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যে স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি আসে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশে রপ্তানি ২.৩ বিলিয়ন ডলার, আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ৮.৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এভাবে বাণিজ্য ভারসাম্য এখনও ঢাকার পক্ষে হলেও, সয়াবিনের মতো কৃষি পণ্যের প্রবেশে নতুন গতিবিধি দেখা যাচ্ছে।
মার্কিন সয়াবিন রপ্তানি কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী জিম সাটার উল্লেখ করেছেন যে, সয়াবিন ও সয়াবিন মিলের রপ্তানি বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় কৃষি পণ্য। তিনি আরও জানিয়েছেন যে, দেশের শীর্ষ সয়াবিন প্রক্রিয়াকরণ সংস্থা এবং মিল আমদানিকারকরা সাম্প্রতিক সময়ে ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের মূল্যের চিঠি স্বাক্ষর করে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন ক্রয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
এই বৃহৎ চুক্তি দেশের সয়াবিন শিল্পে সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করবে, উৎপাদন খরচ কমাবে এবং শেষ ব্যবহারকারীকে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহের সম্ভাবনা বাড়াবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, বিশেষ করে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক উত্তেজনা পুনরায় বাড়লে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে যদি চীন আবার শুল্ক বিরোধের কারণে আমেরিকান সয়াবিনের ক্রয় বন্ধ করে, তবে বাংলাদেশের আমদানিকৃত সয়াবিনের দাম পুনরায় উঁচুতে উঠতে পারে এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের উপর চাপ বাড়তে পারে। তাই বেসরকারি খাতের জন্য সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণ এবং দেশীয় সয়াবিন উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের দামের স্থিতিশীলতা এবং শুল্ক নীতির ধারাবাহিকতা বাংলাদেশি আমদানিকর্তাদের জন্য মূল নির্ধারক হবে। একই সঙ্গে, বাণিজ্যিক ঘাটতি কমাতে এবং কৃষি পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারী নীতি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিনের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও, বৈচিত্র্যময় সরবরাহ চ্যানেল গড়ে তোলা এবং স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা দীর্ঘমেয়াদী বাজার স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি হবে।



