ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের রোমান আহমেদ ও মোসাম্মত মৌসুমি ইসলাম দম্পতি সম্পর্কে ১১ নভেম্বর সন্ধ্যায় স্থানীয় অনুসন্ধান শেষ হয়। রোমানের ডায়াবেটিসে মৃত্যু ঘোষিত হওয়ার পরেও তার বাড়ির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি; শেষ পর্যন্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিসের অনলাইন সিস্টেমে রোমানের জন্মনিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে ঠিকানা যাচাই করা হয়। সিস্টেমে প্রদর্শিত ঠিকানা একই ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রাম হয়, যেখানে তদন্তকারী দল দ্রুত পৌঁছে দম্পতির পরিবারকে সনাক্ত করে। বাড়ির দরজায় ডাক দিলে রোমানের মা খাদিজা বেগম উপস্থিত হন।
রোমান ও মৌসুমীর বয়স যথাক্রমে ১৯ ও ১৮ বছর, এবং ইউনিয়ন পরিষদের রেকর্ডে তাদের ১৯টি সন্তান রয়েছে। সর্বশেষ সন্তান সাচ্চু জারিফের জন্ম ১০ অক্টোবরের একই বছরে (রেকর্ডে ২০২৫) নথিভুক্ত, এবং ৪০ দিন পর ৯ নভেম্বর তার মৃত্যু হয়। একই দিনে, রেকর্ডে ১৩ নম্বর সন্তান মিতু মনি এবং ১৮ নম্বর সন্তান মিলি মনি জন্ম নেয়; মিতু ৯ নভেম্বর, আর মিলি ৩০ অক্টোবরই মারা যায়। উভয়ের মৃত্যুর কারণ রেকর্ডে ‘কার্ডিওজেনিক শক’ বলা হয়েছে।
দুঃখজনকভাবে, রোমানের মৃত্যু তার দুই সন্তান মিতু ও মিলির মৃত্যুর ঠিক আগের দিন ঘটে, আর মৌসুমীর মৃত্যু ১০ অক্টোবরের দিনেই রেকর্ডে দেখা যায়, যা সাচ্চু ও মিতুর জন্মের সঙ্গে একই দিন। তাছাড়া, রেকর্ডে দেখা যায় যে একটি সন্তান তার মায়ের মৃত্যুর ২০ দিন পর জন্ম নেয়, যদিও মা ইতিমধ্যে মৃত। এই অস্বাভাবিক ধারাবাহিকতা এবং সময়সীমা সরকারী তথ্যভান্ডারের রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিসের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন ডাটাবেসে নথিভুক্ত, তবে তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে এসব তথ্য সম্পূর্ণভাবে ভুয়া।
ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তবে এই কেসে দেখা যায় যে তারা ইচ্ছেমতো শিশুর জন্মের তথ্য রেকর্ড করে থাকে। রেকর্ডের বৈধতা যাচাই না করে, অনিয়মিতভাবে ভুয়া সনদ তৈরি করা হয় এবং তা ব্যবহার করে বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধন করা হয়। এই বিষয়টি প্রকাশের পর, স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তারিখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি আদেশ জারি করা হয় এবং অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ফরেনসিক বিশ্লেষণ শুরু হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায় যে রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিসের ই-ভেরিফাই সিস্টেমে প্রবেশ করে ভুয়া জন্ম‑মৃত্যু সনদ তৈরি করা হয়। সিস্টেমে প্রবেশের পদ্ধতি ও তথ্য পরিবর্তনের রেকর্ড দেখায় যে একাধিক সনদ একই সময়ে তৈরি হয়েছে, যা স্বাভাবিক রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া, ইউনিয়ন পরিষদের অফিসে রেকর্ড সংরক্ষণে অপ্রতুলতা ও তদারকি ঘাটতি রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, ভুয়া জন্ম‑মৃত্যু সনদ তৈরি ও ব্যবহার করা বাংলাদেশে অপরাধ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয়। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, এই ধরনের নথি তৈরি, বিক্রি বা ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা আরোপিত হতে পারে। বর্তমানে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আদালতে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে। তদন্তকারী দল আরও জানিয়েছে যে, ভবিষ্যতে অনুরূপ কেলেঙ্কারি রোধের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় তদারকি শক্তিশালী করা এবং ই-ভেরিফাই সিস্টেমের নিরাপত্তা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই কেসটি দেশের তথ্যভান্ডার ব্যবস্থার দুর্বলতা ও তদারকি ঘাটতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সরকারী রেকর্ডের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থানীয় জনগণও এই ধরনের ভুয়া নথি তৈরির বিরুদ্ধে সতর্কতা অবলম্বন করতে এবং কোনো সন্দেহজনক তথ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের এই কেলেঙ্কারির তদন্ত এখনও চলমান, এবং আদালতে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে পরবর্তী তথ্য প্রকাশিত হলে তা জনসাধারণের সঙ্গে শেয়ার করা হবে।



