নিলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বহু ইউনিয়নে আলু বিক্রির দাম এক কেজিতে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত নেমে এসেছে। এই হঠাৎ মূল্য পতন হাজার হাজার ক্ষুদ্র কৃষকের আয়কে শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, ফলে তারা বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন।
আলু চাষের মৌসুমে কৃষকরা আগাম বীজ বপন করে উচ্চ ফলন আশা করে, কিন্তু বিক্রয় মূল্যের অবনতি উৎপাদন খরচকে ছাপিয়ে গেছে। প্রতি বিঘায় উৎপাদন ব্যয় প্রায় চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা, তবে বিক্রয় থেকে আয় মাত্র দশ থেকে বারো হাজার টাকা, ফলে প্রতি বিঘায় ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার লোকসান হচ্ছে।
উত্তর দুরাকুটি গ্রাম থেকে তিন বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করা ছোট কৃষক আবুল কালাম জানান, তিনি ৫০ কেজি আলু বিক্রি করে দুই কেজি গরুর মাংস কেনার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা মেটাতে পারেননি। আলু প্রতি কেজি ছয় টাকা দরে বিক্রি হলে দুই বস্তা (৫০ কেজি) থেকে মোট ছয়শো টাকা পাওয়া যায়, যেখানে উৎপাদন খরচ প্রতি বস্তা এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশো টাকা। ফলে বিক্রয় আয় উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে যথেষ্ট কমে গেছে।
বাহাগিলি ইউনিয়নের আরেকজন বড় কৃষক, আব্দুল আজিজ, ছয় দশ বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষের জন্য দুই লাখ পঁচাস হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। তবে বর্তমান বাজারে আলুর দাম এত কম যে তিনি এক বিঘা আলুও উত্তোলন করতে পারেননি, এবং গত দুই বছরে মোট ছয় লাখ টাকার বেশি লোকসান স্বীকার করেছেন।
কেশবা গ্রামের লুৎফর রহমান লুতু একইভাবে জানান, দুই বছর ধারাবাহিকভাবে আলু চাষে তার মোট লোকসান সাত লাখ টাকা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, তিনি একা নন; হাজার হাজার সমবয়সী কৃষক একই পরিস্থিতিতে আছেন এবং পুরো কিশোরগঞ্জে ক্ষতির পরিমাণ একশো থেকে দেড়শো কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে।
কিশোরগঞ্জ উপজেলায় কৃষি দপ্তর জানিয়েছে, চলতি রবি মৌসুমে ৬,৬০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল, তবে প্রকৃত উৎপাদন লক্ষ্য অতিক্রম করেছে। রোগবালাইমুক্ত অবস্থায় প্রতি হেক্টরে বিশ দুই থেকে ত্রিশ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, যা ঐতিহাসিক রেকর্ডের চেয়ে বেশি। তবে বাজারে দাম হ্রাসের ফলে অনেক কৃষক ফসলকে জমিতেই ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সাধারণত আলু প্রতি কেজিতে বিশ থেকে পঁচিশ টাকা দরে বিক্রি হয়, কিন্তু এই বছর বিক্রয় শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই দাম পাঁচ থেকে দশ টাকা পর্যন্ত কমে গিয়েছে। বর্তমানে দাম পাঁচ থেকে ছয় টাকা প্রতি কেজি, যা উৎপাদন খরচের চেয়ে বহু গুণ কম। এই দ্রুত মূল্য পতন কৃষকদের আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছে এবং ঋণদাতাদের কাছে ঋণ পরিশোধে সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
বাজারের অতিরিক্ত সরবরাহ, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং মৌসুমী চাহিদার অমিল মূল্যের নিচে নামার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রয় চ্যানেল সংকুচিত হয়েছে, ফলে দাম দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা বিক্রয় না করা আলু জমিতে রেখে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি দাম পুনরুদ্ধার না হয় এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থা না গড়ে ওঠে, তবে কৃষকদের ঋণভার বাড়বে এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষের পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে। সরকারী হস্তক্ষেপ, যেমন ন্যূনতম মূল্য গ্যারান্টি, সঞ্চয় সুবিধা এবং বাজার সংযোগের উন্নতি, এই সংকট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া, বিকল্প ফসলের প্রচার এবং কৃষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক হবে।
সারসংক্ষেপে, কিশোরগঞ্জে আলু চাষের উচ্চ উৎপাদন সত্ত্বেও বাজারে দাম হ্রাসের ফলে কৃষকরা বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে। উৎপাদন খরচ ও বিক্রয় আয়ের পার্থক্য, অতিরিক্ত সরবরাহ এবং সংরক্ষণ অবকাঠামোর ঘাটতি মূল সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। নীতি নির্ধারকদের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং বাজারের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং কৃষকদের জীবিকা সংকটময় হয়ে উঠতে পারে।



