২৪ ডিসেম্বর রাত আটটার কাছাকাছি ওড়িশার সম্বলপুর জেলায় একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে। অ্যানিথাপল্লী থানার অধীনে দানিপালি এলাকায়, ১৯ বছর বয়সী মুসলিম শ্রমিক জুয়েল রানা, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে বসবাসকারী, ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে স্থানীয়দের দ্বারা পিটে নিহত হন। একই সময়ে তার দুই সহকর্মী মারধরের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
পুলিশের মতে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন স্থানীয় প্রথমে শ্রমিকদের কাছ থেকে বিড়ি চেয়েছিলেন। বিড়ি পাওয়ার পর তারা শ্রমিকদের পরিচয় যাচাই করতে চেয়ে আধার কার্ড দেখতে চায়। একজন শ্রমিক কার্ড আনতে ঘরে গিয়ে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক হিংসা শুরু হয়।
শ্রমিক পল্টু শেখের বর্ণনা অনুযায়ী, জুয়েল এবং অন্য দুইজন শ্রমিক বাড়ির কাছাকাছি বসে খাবার খাচ্ছিলেন, যখন স্থানীয়রা এসে তাদের বিড়ি চায়। বিড়ি দেওয়ার পর তারা শ্রমিকদের বাংলাদেশি বলে সন্দেহ করে এবং পরিচয়পত্রের দাবি করে। আধার কার্ড আনতে গিয়ে হিংসা শুরু হওয়ায় জুয়েল মারাত্মক আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
অন্য শ্রমিক সাদ্দাম হুসেন জানান, হঠাৎ চিৎকার শোনার পর তারা ঘর থেকে বেরিয়ে দেখেন স্থানীয়রা অন্ধকারে পালিয়ে যাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ আহতদের নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে জুয়েলের শ্বাসের শেষ নিঃশ্বাস ইতিমধ্যে শেষ হয়ে যায়।
সম্বলপুরের মহকুমা পুলিশ অফিসার তফান বাগ জানান, তিনজন শ্রমিক বিড়ি খাওয়ার সময় কয়েকজন স্থানীয় এসে আধার কার্ড দেখার দাবি করে এবং তা না পেলে মারধর করে। এক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটার পর অবিলম্বে দেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে এবং পরিবারকে জানানো হয়েছে। মোট ছয়জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে; তদন্ত চলমান।
স্থানীয় শ্রমিক সংগঠন উল্লেখ করেছে, কেন্দ্রীয় সরকারের বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের সনাক্তকরণের জন্য চালু করা বিশেষ প্রক্রিয়ার ফলে বাংলাভাষী মুসলমানদের ওপর এ ধরনের হিংসা বাড়ছে। তারা দাবি করে, পূর্বে একই ধরনের হুমকি থাকলেও এ রকম মারাত্মক হিংসা আগে দেখা যায়নি।
এই ঘটনার সঙ্গে সমান সময়ে ভারতের তিনটি রাজ্যে একই মাসে গণপিটুনির ফলে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা সামাজিক উত্তেজনা ও জাতিগত বৈষম্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে; তাদের বিরুদ্ধে হিংসা, হত্যা এবং অপরাধমূলক দেহহানি সংক্রান্ত আইনের অধীনে মামলা দায়ের করা হবে। দেহের ময়নাতদন্তের ফলাফল ও অপরাধীদের পটভূমি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
এই ধরনের ঘটনা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যারা শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও বৈষম্যবিরোধী নীতি প্রয়োগের আহ্বান জানাচ্ছেন। সরকারী দিক থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি, তবে তদন্তের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিবিসি সূত্রে জানানো হয়েছে, জুয়েলের পরিবারকে দুঃখের সঙ্গে দেহের ময়নাতদন্তের ফলাফল জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের হিংসা রোধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষের মূল কারণ হিসেবে জাতিগত সন্দেহ ও পরিচয়পত্রের দাবি উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সমাধানের জন্য সামাজিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।



