চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নকে বাধা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বেইজিংয়ের প্রতিরক্ষা নীতি বিকৃত করে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
লিনের বক্তব্যের সময়, সাংবাদিকরা সীমান্ত বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বললেন, চীন ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক বন্ধুত্বকে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে এবং সীমান্ত সমস্যাগুলো চীন ও ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে।
চীনের দৃষ্টিতে, কোনো তৃতীয় দেশের মন্তব্যে সীমান্ত বিষয়ের ওপর হস্তক্ষেপ করা অনুচিত। লিন উল্লেখ করেন, “আমরা এই বিষয়টি নিয়ে কোনো দেশের রায় গ্রহণে আপত্তি জানাই না,” এবং এভাবে চীন তার স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করতে চায়।
পেন্টাগনের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনেও চীনের একই রকম কৌশল উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন সম্ভবত হ্রাসপ্রাপ্ত ভারত-চীন উত্তেজনা ব্যবহার করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে চায়, যার মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের গভীরতা রোধ করা এবং ওয়াশিংটনকে আঞ্চলিক প্রভাব থেকে বাদ দেওয়া।
লিনকে এই প্রতিবেদনটির দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ফলে তিনি স্পষ্ট করে জানান যে চীন কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজের কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে। তিনি যুক্তি দেন, চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নয়ন স্বতন্ত্র এবং তা অন্য কোনো দেশের নীতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়।
এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভারত-চীন সম্পর্কের ওপর প্রভাব কমাতে চাওয়া কৌশলকে চীন স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে, যা এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর জটিলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নয়ন যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া এগোয়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে। তবে একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলোও এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে, চীন ও ভারত উভয়ই কূটনৈতিক চ্যানেল চালু রেখেছে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস বাড়াতে বিভিন্ন স্তরে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই আলোচনার ফলাফল ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতিতে প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে, চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নকে সীমাবদ্ধ করা কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন থেকে ভারতকে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে এবং এশিয়ায় তার প্রভাব বাড়াতে চায়। তাই চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নকে বাধা দেওয়া তার কূটনৈতিক লক্ষ্যকে সমর্থন করে।
চীনের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপগুলোকে ‘বিকৃত’ বলা হয়েছে, যা বেইজিংয়ের প্রতিরক্ষা নীতি এবং কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতি আক্রমণ হিসেবে দেখা হয়। লিন জিয়ান এই বিষয়টি তুলে ধরে চীনের স্বতন্ত্র নীতি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়েছেন।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে, চীন ও ভারত উভয়ই উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক মিটিংয়ের পরিকল্পনা করছে, যেখানে সীমান্ত সমস্যার সমাধান এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলো আলোচনা হবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক দলও এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর মনোযোগ দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাবে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নয়ন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কৌশল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতির পারস্পরিক প্রভাব ভবিষ্যতে কী রকম বিকাশ পাবে, তা সময়ই প্রকাশ করবে।



