২৫ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় আড়িখোলা রেলওয়ে স্টেশনের পূর্বে টেকপাড়া এলাকায় এক দুঃখজনক দুর্ঘটনা ঘটেছে। নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি অতিক্রম করার সময় তিনজন নারী—একজন নানী, তার নাতনি এবং প্রতিবেশী—অনিচ্ছাকৃতভাবে ট্রেনের নিচে গড়িয়ে পড়ে। দুইজনের মৃত্যু তৎক্ষণাৎ ঘটেছে, আর তৃতীয়জনকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন।
মৃত্যুর শিকার তিনজনের পরিচয় নিম্নরূপ। কালীগঞ্জ পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের দেওয়ালটেক গ্রাম থেকে মোবারক হোসেনের স্ত্রী সাদিয়া বেগম, বয়স ২৪, নানী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। একই গ্রাম থেকে বাবু মিয়ার ১৩ বছর বয়সী কন্যা অনাদি আক্তার নাতনি ছিলেন, আর নরসিংদী শিবপুরের শিবপুর উপজেলায় অবস্থিত মরজাল এলাকার বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী কমলা বেগম নানী ছিলেন। অনাদি ও কমলা দুজনের নাতনি ও নানী হিসেবে পরিচয়, আর সাদিয়া বেগম উভয়ের প্রতিবেশী ছিলেন।
দুর্ঘটনার সময় নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা থেকে রওনা হয়ে আড়িখোলা রেলওয়ে স্টেশন পার হচ্ছিল। ট্রেনের গতি ও সময়সূচি অনুযায়ী বিকেল পাঁচটায়ই গাড়ি স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছায়। সেদিন বিকেলে নানী-নাতনি ও সাদিয়া বেগম একসঙ্গে হাঁটতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন; অপ্রস্তুত অবস্থায় তারা ট্রেনের পথে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে। ট্রেনের গতি ও আকারের কারণে দুজনের মৃত্যু তৎক্ষণাৎ নিশ্চিত হয়, আর তৃতীয়জনকে তৎক্ষণাত্ স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার করে নিকটস্থ কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
কালীগঞ্জ থানা থেকে ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ ফোর্স পাঠানো হয়। থানার ওসি মো. জাকির হোসেন ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশ ও থানা পুলিশ সমন্বয়ে মৃতদেহের হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। রেলওয়ে নরসিংদী পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক দিলীপ চন্দ্র সরকার জানান, মৃতদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করা হয়েছে এবং পরিবারের অনুরোধে কোনো ময়নাতদন্ত না করে দেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
আহত অনাদি আক্তারকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। সেখানে উপস্থিত চিকিৎসক জিয়াউর রহমান জানান, রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি মৃত ঘোষণা করা হয়। সাদিয়া বেগম ও কমলা বেগমের দেহও একই সময়ে স্থানীয় রেলওয়ে পুলিশ কর্তৃক গ্রহণ করা হয় এবং পরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দুর্ঘটনার পর রেলওয়ে ও থানা পুলিশ বিষয়টি তদন্তের অধীনে রাখে। কালীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওবায়দুল হক জানান, রেলওয়ে সংক্রান্ত ঘটনার জন্য রেলওয়ে পুলিশকে সমন্বয় করে তদন্ত চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে, রেলওয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি দিক থেকে, ঘটনাস্থলে একটি ফার্মাসি রেজিস্টার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হবে। তদন্তের সময় ট্রেনের গতি, রেলওয়ে সিগন্যালিং সিস্টেম এবং পথচারীদের নিরাপত্তা সচেতনতা ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করা হবে। পরিবারকে যথাযথ সহায়তা প্রদান এবং শোককালীন প্রয়োজনীয়তা পূরণে স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে।
এই ধরনের ট্রেন-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা সমাজে নিরাপত্তা সচেতনতার অভাব এবং রেলওয়ে অবকাঠামোর দুর্বলতা নির্দেশ করে। কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হল রেলওয়ে পথের পার্শ্ববর্তী এলাকায় সঠিক সাইনেজ, বাধা এবং পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা নিশ্চিত করা, যাতে পথচারীরা অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে না পড়ে। একই সঙ্গে, স্থানীয় বাসিন্দাদেরও ট্রেনের চলাচল সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং অপ্রয়োজনীয় পথে চলা থেকে বিরত থাকা জরুরি।



