গাজা শহরের হোলি ফ্যামিলি চার্চে দুই বছর পর প্রথমবারের মতো ক্রিসমাস গাছ জ্বালানো হয়েছে, যেখানে শীতের সন্ধ্যায় বিশাল গাছের আলো ও সজ্জা গাজা বাসিন্দাদের জন্য এক ধরনের আশার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক অভিযান চলাকালীন গাজা উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর, এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি গৃহযুদ্ধের ছায়ায় বেঁচে থাকা মানুষের জন্য এক বিরল স্বস্তি ও আনন্দের মুহূর্ত প্রদান করেছে।
গাছটি আলোকিত করার সঙ্গে সঙ্গে, গির্জার প্রধান হলের মধ্যে ক্রিসমাস ইভের মিস অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে স্থানীয় ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষও উপস্থিত ছিলেন। গির্জার দরজা বন্ধ করে, সুরক্ষার জন্য সীমিত আকারের সমাবেশের পরিকল্পনা করা হলেও, ঘণ্টার শব্দ ও গাছের ঝলক মানুষকে একত্রে আনন্দের অনুভূতি দেয়।
গির্জার এক সদস্য, ৫৮ বছর বয়সী দিমিত্রি বুলুস, যিনি গাজা শহরের তল আল-হাওয়া এলাকায় ইসরায়েলি শেলিংয়ের ফলে তার পরিবারসহ স্থানচ্যুত হয়েছিলেন, তিনি এই অনুষ্ঠানের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, “যুদ্ধের সময় আমরা গির্জায় আশ্রয় নিতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে দু’বার আঘাত হানে, এবং আমরা প্রিয়জন হারিয়েছি। তখন সবকিছুই রঙহীন হয়ে গিয়েছিল, ভয় ও শোকের ছায়া ছড়িয়ে ছিল। এখন, গাছের আলো দেখলে মনে হয় যেন সবকিছু আবার রঙ ফিরে পাবে।”
বুলুসের মতামত গাজা বাসিন্দাদের মধ্যে বিস্তৃত আশার প্রতিফলন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে এই ক্রিসমাস এবং নতুন বছর গাজার উপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা ও মানবিক সংকটের সমাপ্তি ঘটাবে, এবং ভবিষ্যতে জীবন পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। তার কথায় গাজা মানুষের স্থিতিস্থাপকতা ও পুনরুদ্ধারের ইচ্ছা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
হোলি ফ্যামিলি চার্চ গাজার একমাত্র ক্যাথলিক প্যারিশ, যা দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহন করে। যুদ্ধের সময়, পোপ ফ্রান্সিস প্রায় প্রতিদিনই এই প্যারিশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন, যা গাজার ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পোপের এই ধারাবাহিক সংযোগ গাজার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মানসিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক মনোযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
প্যালেস্টাইনের মোট ক্যাথলিক জনসংখ্যা প্রায় ৪৭,০০০ থেকে ৫০,০০০, যার বেশিরভাগই পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসবাস করে। গাজার মধ্যে যুদ্ধের আগে প্রায় ১,০০০ ক্যাথলিক বাসিন্দা ছিলেন, তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান গাজার ধর্মীয় বৈচিত্র্যের সংকটকে তুলে ধরে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, গাজার ক্রিসমাস উদযাপনকে মানবিক সংকটের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা গাজার ওপর আরোপিত অবরোধের অবসান ও মানবিক সাহায্যের প্রবাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ প্রতিনিধিত্বকারী গাজার মানবিক অবস্থা নিয়ে এক সম্মেলনে উল্লেখ করেন, “গাজার মানুষদের মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
ইসরায়েলি সরকারও গাজার ধর্মীয় স্থানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে, যদিও বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। গাজা গির্জার আলো জ্বালানোর এই অনুষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নথিভুক্ত করেছে, যা গাজার মানবিক পরিস্থিতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আলো ফেলছে।
গাজা অঞ্চলের এই ক্রিসমাস উদযাপন, যদিও সীমিত এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তবু গাজার বাসিন্দাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমর্থন হিসেবে কাজ করছে। গাছের আলো ও মিসের সুরেলা সুর গাজার মানুষের হৃদয়ে আশা ও পুনরুদ্ধারের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে শান্তি ও স্থিতিশীলতার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
গাজার ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের এই অল্প সময়ের উদযাপন, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মানবিক সহায়তার সঙ্গে মিলিয়ে, গাজার ভবিষ্যৎ গঠন ও পুনর্নির্মাণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গাজার মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সহ, এখনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও, এই ধরনের ছোট ছোট আশার মুহূর্তগুলো তাদের জীবনের পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের প্রত্যাশা বাড়িয়ে তুলছে।



