আলজেরিয়ার জাতীয় সংসদ বুধবার এক ঐক্যমত ভোটে নতুন আইন অনুমোদন করে, যার মাধ্যমে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনটি ১৮৩০ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত ফ্রান্সের শাসনকালে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সম্পদ লুণ্ঠনকে আইনি দায়িত্বে আনতে চায়।
সেশন চলাকালে সংসদ সদস্যরা জাতীয় পতাকার রঙের স্কার্ফ পরিধান করে, “আলজেরিয়া চিরজীবী” স্লোগান গাইতে গাইতে আইনটি অনুমোদন করেন। এই দৃশ্যটি দেশের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রতি দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
আইনের মূল দাবি হল ফ্রান্সের কাছে সরকারী ক্ষমা প্রার্থনা এবং ঐতিহাসিক ক্ষতিপূরণের দাবি করা। সংসদ সদস্যরা উল্লেখ করেন, উপনিবেশিক শাসনের ফলে সৃষ্ট শারীরিক, মানসিক ও সম্পদগত ক্ষতির পূর্ণ পরিশোধ আলজেরিয়ার জনগণের মৌলিক অধিকার।
আইনি নথিতে ফরাসি শাসনের সময়কালে সংঘটিত অপরাধের তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে পারমাণবিক পরীক্ষার অনুমোদন, অনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ড, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এবং ব্যাপক সম্পদ লুণ্ঠন উল্লেখযোগ্য। আইনটি এইসব কাজকে আন্তর্জাতিক অপরাধের শ্রেণিতে রাখে এবং ভবিষ্যতে আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করে।
বিশ্লেষকরা স্বীকার করেন, যদিও আন্তর্জাতিক আদালতে এই আইনটি প্রয়োগযোগ্য নাও হতে পারে, তবু এটি আলজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ফরাসি উপনিবেশের স্মৃতি নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে ইতিমধ্যে একটি বড় ফাটল দেখা যাচ্ছে।
সংসদ স্পিকার ইব্রাহিম বুগালি উল্লেখ করেন, এই আইন দেশের ভিতরে ও বাইরে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে আলজেরিয়ার জাতীয় স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে না এবং এ বিষয়ে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। তিনি যুক্তি দেন, ঐতিহাসিক সত্যকে স্বীকার করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য।
আইনের পাঠে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ফরাসি উপনিবেশের ফলে সৃষ্ট সব বস্তুগত ও নৈতিক ক্ষতির জন্য পূর্ণ ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া আলজেরিয়ার রাষ্ট্র ও জনগণের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। এই ধারাটি ভবিষ্যতে পুনর্বাসন ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
ঐতিহাসিকভাবে ফ্রান্স ১৮৩০ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত আলজেরিয়ার উপর কঠোর শাসন চালিয়েছে; এই সময়ে গৃহযুদ্ধ, গণহত্যা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং আদিবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ব্যাপক নিপীড়ন ঘটেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত প্রায় পনেরো লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে আলজেরিয়ান সূত্র দাবি করে।
আইনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে আলজেরিয়া ফরাসি সরকারকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণ চাওয়ার জন্য কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, দেশের অভ্যন্তরে এই আইনকে সমর্থনকারী ও বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ বাড়তে পারে, যা রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।
এই আইনটি আলজেরিয়ার ইতিহাস পুনর্লিখনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের জাতীয় পরিচয়কে শক্তিশালী করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অতীতের কষ্টকে স্বীকৃতি দিতে সহায়তা করবে।



