২৫ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক ঢাকা হাইকমিশনে একটি বার্তা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তিনি ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি পরিধান করে বাংলাদেশি রীতিতে বড়দিনের অনুষ্ঠান পালন করছেন। এই পদক্ষেপটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে কূটনৈতিক বন্ধনকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
টাঙ্গাইলের হস্তশিল্প শাড়ি সম্প্রতি ইউনেস্কো দ্বারা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের হস্তশিল্পের মর্যাদা বাড়িয়ে তুলেছে। হাইকমিশনারের এই পছন্দটি ঐ স্বীকৃতিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্লেষকরা দেখছেন।
ব্রিটিশ হাইকমিশন এই অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেছে, কুকের উপস্থিতি এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবহার বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশের একটি উদাহরণ। তিনি নিজে শাড়ি পরিধান করে স্থানীয় রীতিনীতির সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেছেন, যা দু’দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঢাকার বিভিন্ন দূতাবাসও বড়দিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছে। ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, কানাডা, চীন, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া সহ বহু দেশের মিশনগুলো হাইকমিশনারের বার্তাকে স্বাগত জানিয়ে তাদের নিজস্ব শুভেচ্ছা প্রকাশ করেছে। এই সমবেত শুভেচ্ছা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি সাংস্কৃতিক সংযোগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, হাইকমিশনারের এই উদ্যোগটি কেবল একধরনের সাংস্কৃতিক উদযাপন নয়, বরং কূটনৈতিক মঞ্চে সফট পাওয়ার ব্যবহারের একটি উদাহরণ। সফট পাওয়ার বলতে বোঝায়, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। টাঙ্গাইলের শাড়ি পরিধান করে কুক এই নীতি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করছেন।
ব্রিটেন এবং বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিময় প্রোগ্রামগুলোও সম্প্রসারিত হয়েছে। কুকের এই সাংস্কৃতিক উদ্যোগটি এই সহযোগিতার নতুন মাত্রা যোগ করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
ইউনেস্কো স্বীকৃতি পাওয়া টাঙ্গাইলের শাড়ি, দেশের হস্তশিল্পের বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। হাইকমিশনারের এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতিকে আরও দৃঢ় করার পাশাপাশি, স্থানীয় শিল্পীদের জন্য নতুন বাজারের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে এমন আরও সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রমের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সমৃদ্ধ করবে। উদাহরণস্বরূপ, আগামী বছরগুলিতে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে হস্তশিল্প প্রদর্শনী, শিক্ষামূলক কর্মশালা এবং সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ধরনের সাংস্কৃতিক কূটনীতি, বিশেষ করে বড়দিনের মতো আন্তর্জাতিক ছুটির দিনে, উভয় দেশের নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে সহায়তা করে। কুকের শাড়ি পরিধান করা, স্থানীয় রীতির সঙ্গে নিজেকে সামঞ্জস্য করা, এবং অন্যান্য মিশনের শুভেচ্ছা গ্রহণ করা, এই সবই একত্রে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলেছে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানটি, হাইকমিশনারের ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি, ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গৃহীত একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই নীতি, দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার জন্য সাংস্কৃতিক সংযোগকে মূল উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে।
সারসংক্ষেপে, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি পরিধান করে বড়দিন উদযাপন করা, কেবল একটি রীতিনীতির পালনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি, সফট পাওয়ার এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সমন্বয় ঘটায়। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা, দু’দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমুখী করে তুলবে।
এই অনুষ্ঠানটি, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বকে পুনরায় জোরদার করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও সমন্বিত সাংস্কৃতিক বিনিময়কে উৎসাহিত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।



