কম্বোডিয়ার প্রেহ ভিহের প্রদেশে থাইল্যান্ডের সৈন্যরা সোমবার হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর একটি মূর্তি ধ্বংস করে তোলেন, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র নিন্দা পেয়েছে। মূর্তিটি ২০১৪ সালে নির্মিত এবং সীমান্ত থেকে প্রায় ৩২৮ ফুটের মধ্যে কম্বোডিয়ার ভূখণ্ডে অবস্থিত। ঘটনাটি দুই দেশের চলমান সীমান্তসংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, যা গত ডিসেম্বরের শুরু থেকে তীব্রতর হয়েছে।
মূর্তিটি হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকাংশ বসবাসকারী এলাকায় ছিল এবং স্থানীয়দের জন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহন করত। মূর্তির ধ্বংসের সময় কোনো প্রাণহানি না ঘটলেও, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদন পাওয়া গেছে।
কম্বোডিয়ার প্রেহ ভিহের প্রদেশের মুখপাত্র লিম চানপানহা জানিয়েছেন, ধ্বংসকৃত মূর্তিটি সম্পূর্ণভাবে কম্বোডিয়ার ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত এবং থাইল্যান্ডের সীমান্ত থেকে মাত্র ৩২৮ ফুট দূরে। তিনি উল্লেখ করেন, মূর্তিটি ২০১৪ সালে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল।
থাইল্যান্ডের সেনারা মূর্তিটি ভাঙার সময় কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা সমন্বয় না করে কাজটি সম্পন্ন করেছে বলে জানা যায়। ঘটনাটি ঘটার পর থাইল্যান্ডের কোনো সরকারি ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি, তবে স্থানীয় সূত্রে বলা হচ্ছে, সীমান্তে চলমান নিরাপত্তা অপারেশনের অংশ হিসেবে এই কাজটি করা হয়েছে।
কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সীমান্তসংঘর্ষ ডিসেম্বরের শুরুর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমণ চালিয়েছে, যার ফলে সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উত্তেজনা পূর্বে সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হওয়া ও সামরিক উপস্থিতি বাড়ার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ঘটনাটিকে “অত্যন্ত অসম্মানজনক” বলে নিন্দা করেন এবং উল্লেখ করেন, এই ধরনের কাজ বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঘাত করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ধর্মীয় প্রতীক ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, এই ঘটনা কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে, আঞ্চলিক সংস্থা ASEAN-এর ভূমিকা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে সংস্থা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানাতে পারে।
একজন কূটনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “সীমান্তে ধর্মীয় প্রতীক ধ্বংস করা কেবলমাত্র স্থানীয় উত্তেজনা বাড়ায় না, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা দ্রুত কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।” তিনি আরও যোগ করেন, উভয় দেশের সরকারকে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা উচিত, যাতে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
আসন্ন সপ্তাহে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন, উভয় পক্ষই এই ঘটনাকে একটি সংকটের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করে, সীমান্তে শান্তি রক্ষার জন্য যৌথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় শক্তিরও এই সংঘর্ষে স্বার্থ থাকতে পারে, যা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অতিরিক্ত জটিলতা যোগ করতে পারে।
অবশেষে, ধর্মীয় প্রতীকের ধ্বংসের ফলে উত্থাপিত নৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই ঘটনা কেবলমাত্র দুই দেশের সীমান্তসংঘর্ষের একটি দিক নয়, বরং ধর্মীয় সহনশীলতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে উভয় দেশের ইচ্ছা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার হস্তক্ষেপের উপর।



